Warning: Creating default object from empty value in /home/genocidebangladesh/genocidebangladesh.org/wp-content/themes/canvas/functions/admin-hooks.php on line 160

বাংলায় আগ্রাসন: আমাদের অবশ্যই যা করতে হবে

রেগ প্রেন্টিস

দি সানডে টাইমস, ১১ জুলাই, ১৯৭১

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

[মি. প্রেন্টিস হলেন সংসদীয় একটি দলের সদস্য যারা সম্প্রতি পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তান সফর করেছেন।]

রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া যে-পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাতে পরিস্থিতি কেবল খারাপই হতে পারে। এটা পাকিস্তান এবং ভারত উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। পূর্ব পাকিস্তানে অবশ্য চরম নিষ্ঠুরভাবে দমন-পীড়ন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই, কারণ সাত কোটি বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর কয়েক হাজার সৈন্য দিয়ে ক্ষমতা খাটাতে গেলে এছাড়া কোনো উপায় নেই। সৈন্যসংখ্যা খুব কম। তাদের জন্য নানা সরবরাহ ও সাহায্য আসছে ভারতের দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে ৩,০০০ মাইল পার হয়ে। দেশটির কোনো কোনো অংশ গেরিলা আক্রমণের জন্য খুবই উপযুক্ত অঞ্চল। গেরিলারা ভারতে আশ্রয় নিতে পারে এবং উদ্বাস্তুদের মধ্য থেকে তাদের নিয়োগসংখ্যা বাড়তে পারে। একাধিক পর্যবেক্ষক মনে করেন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ভিয়েতনামের মতো অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।

ভারতের দিক থেকেও পরিস্থিতি সমানভাবে হতাশাজনক। সীমান্ত-রাজ্যগুলোতে স্থানীয় কর্মকর্তা, ডাক্তার ও নার্সরা বেশিরভাগ শরণার্থীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুব সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব ঘটছে এমন একটি দেশে যেটি খুব দরিদ্র এবং এর বেশিরভাগই ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে যা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম দরিদ্র এবং জনবহুল একটি অঞ্চল। স্থানীয় প্রশাসন অন্যান্য কাজকর্ম বাদ দিয়ে উদ্বাস্তু-সমস্যা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে; স্থানীয় উন্নয়ন-কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে; বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে কারণ সেগুলো উদ্বাস্তুদের দখলে। উদ্বাস্ত-শিবিরগুলোতে বিস্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, মাসের পর মাস অলসভাবে কাটাতে বাধ্য হবার কারণে। স্থানীয় জনগণের মধ্যেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে কারণ তারা দেখছে যে উদ্বাস্তুরাই তাদের চাইতে বেশি খাবার পাচ্ছে, এবং তা পাচ্ছে ফ্রি, এদিকে তারা সারা সপ্তাহ জুড়ে কাজ করে মরছে। কিন্তু উদ্বাস্তুদের কাজ দিয়ে এসমস্যার সমাধান করা যাবে না, কারণ ইতোমধ্যেই চরম বেকারত্ব রয়েছে।

বিশ্বকে অবশ্যই এই বোঝার বৃহত্তর অংশ ভাগাভাগি করতে হবে। বাকি বিশ্ব যে-পরিমাণ সাহায্য প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে তাতে ভারতের হিসাব অনুযায়ী ছ-মাসের কাজ চলবে। বেশিরভাগ দেশকে আরো বেশি সাহায্য প্রদানের কথা বলতে হবে এবং ধরে নিতে হবে দীর্ঘ সময়ের জন্য এটা চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সাহায্যের পরিমাণ যতই বেশি হোক না কেন ভারতকে এ-পরিস্থিতির জন্য চরম মূল্যই দেতে হবে এবং যত সময় যাবে তার পরিমাণও বাড়তে থাকবে। এই নিম্নগামী কুণ্ডলীকে উল্টে দেওয়া যাবে তখনই যখন পূর্ব পাকিস্তানের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক সমাধান দেয়া যাবে। তার মানে, সমাধানটি শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। উপনিবেশ উঠে যাবার সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে এর মিল রয়েছে। রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দ, যাদের ওপর জনগণের আস্থা রয়েছে, কেবল তারাই কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারেন। ইয়াহিয়া খানকে অবশ্যই হয় এটা বুঝতে হবে অথবা তার দমননীতি চালিয়ে যেতে হবে, যে-নীতি আজ অথবা কাল ব্যর্থ হবেই।

ধরা যাক, শেখ মুজিব জেল থেকে মুক্তি পেলেন, আওয়ামী লীগকে মেনে নেয়া হলো, এবং সত্যিকারের আলোচনা শুরু হলো। এর ফলে কী পাওয়া যাবে? যে-ছয় দফার ওপর ভিত্তি করে আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে জিতেছে, সেই ছয় দফা অনুসারে পূর্ব পাকিস্তান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বশাসনের সুযোগ চাইবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা থাকবে। অখণ্ড পাকিস্তানের ধারণা টিকে থাকবে কিন্তু পূর্বের প্রাদেশিক সরকার নিজ ভাগ্য নির্মাণে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এটা খুবই সন্দেহজনক যে এই সমাধান আদৌ সম্ভব কিনা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বহু রক্তপাত হয়েছে এবং তিক্ততা দেখা গেছে।

জরুরি বিষয় নিশ্চয় এরকম: সমাধান যদি শিথিল ফেডারেশনের হয় অথবা (তার চাইতেও এগিয়ে) পূর্ণ স্বাধীনতার, সে-সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা কেবল আওয়ামী লীগেরই। কারণ তারাই পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র আস্থাভাজন প্রতিনিধি। তারা অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিবে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের অবশ্যই তা মেনে নিতে হবে। বর্তমানে সামরিক শাসকরা অবশ্য সেরকম কিছু করার মতো মানসিকতায় নেই। তারা গতানুগতিক কথাই বলে যাচ্ছেন। তারা বারংবার বলে যাচ্ছেন যে সেনাবাহিনীকে ‘আইন-শৃঙ্খলা-পরিস্থিতি’র উন্নতি ঘটাতে হবে;
ভারতীয় মদদপুষ্ট কয়েকজন ‘উচ্ছৃঙ্খল’-এর কারণেই এতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে; শরণার্থীরা দেশে ফিরে যেতে চায় কিন্তু ভারতীয়রা তাদের যেতে দিচ্ছে না; পূর্ব পাকিস্তানে জনজীবন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে আসছে; বিশ্ববাসীর ভারতীয়দের দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

পরিবর্তনের সত্যিকারের সম্ভাবনা দু-টি বিষয়ের ওপরে নির্ভর করছে: পূর্ব বাংলাকে ঠাণ্ডা রাখতে তাদের ক্রমাগত ব্যর্থতা ও বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ। দেশটি রফতানি মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বিরাটা ক্ষতির মুখোমুখি। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের পণ্য রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না এবং পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যদিও অন্য দিক থেকে ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে’ বলে দাবি করা হচ্ছে (পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিমের তুলনায় অনেক দরিদ্র কিন্তু তারাই বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ অর্জন করে থাকে)। এবছরের শেষ নাগাদ, সম্ভবত দুর্ভিক্ষ আকারেই, গুরুতর খাদ্যাভাব দেখা দেবে। কারণ কয়েক মাসের মধ্যে যে-ফসল লাগানোর কথা, তা লাগাতে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। যাতায়াত-ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হয়ে যাবার কারণে পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে পশ্চিমে খরার কারণে কমই ফসল হয়েছে যেখান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বীজসংকটের মোকাবেলা করা হয়ে থাকে।

এসব বিপদের মুখে পশ্চিমা সাহায্যের কনসোর্টিয়াম সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরে অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্য নতুনভাবে আবেদন জানাবে না। চলতি প্রকল্পগুলো শেষ হবে কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো সিদ্ধান্তে অবিচল থাকলে বৈদেশিক সাহায্য শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকবে এবং সামনের মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ঘনীভূত হবে। এমনকি স্বাভাবিক সময়ে এধরনের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য হতো বিরাট আঘাত।

পাকিস্তানের যেসব জেনারেলরা দেশটিকে চালান তারা অর্থনীতি সামন্যই বোঝেন, কিন্তু আজ অথবা কাল কঠোর পরিস্থিতি তাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে। এটাই আমাদের একমাত্র আশা।

আমি বিশ্বাস করি একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির পক্ষে চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনটি উপায় আছে। প্রথমত, পশ্চিমা শক্তি অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান না-করার সিদ্ধান্তে অটল থাকবে (ত্রাণসাহায্যের কথা আলাদা, পূর্ব পাকিস্তানে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ এড়াতে জাতিসংঘের সহায়তায় ত্রাণতৎপরতা চালাতে হবে)। রাজনৈতিক সমাধানের জন্য অর্থনৈতিক সাহায্যকে ব্যবহার করার বিপক্ষে অনেক যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু এটি একটি সম্পূর্ণ পৃথক পরিস্থিতি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, খুব নিকট ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানে কার্যকর উন্নয়ন প্রকল্প নেবার সম্ভব হবে না। তাই দেশটিকে যেকেনো ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য দেয়া হলে তা কেবল পশ্চিম পাকিস্তানেই ব্যবহৃত হবে। সাহায্য না-দেয়া বরং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুক্তি দিতে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে দমিয়ে রাখার সম্পদগুলোকে নিঃশেষ করতে কাজ করতে পারে। বৈদেশিক উন্নয়নের সাবেক মন্ত্রীর অভিজ্ঞতা থেকে আমি বিশ্বাস করি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাহায্যের বিষয়টি জুড়ে দেয়া ১০০ ভাগের ৯৯ ভাগের ক্ষেত্রেই অনুচিত — কিন্তু এটি হলো সেই ১০০তম ক্ষেত্র। একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য যেকোনো ধরনের ক্ষমতাই ব্যবহার করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানোর প্রক্রিয়াকে শিগগীরই বন্ধ করতে হবে। বিশ্বমত ওয়াশিংটনের সেইসব সিনেটর ও কংগ্রেসসদস্যদের মতোই গড়ে ওঠা উচিত যারা মার্কিন প্রশাসনকে তার নীতিকে পাল্টানোর জন্য বলেছিলেন। পাকিস্তানের সেনাশক্তিকে মদদ দেবার মাধ্যমে হলেও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের এরকম অবস্থানের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, সব ধরনের সরকার, সংসদ ও প্রভাবশালী ব্যাখ্যাকারদের সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। এটা পরিস্কার বুঝতে হবে যে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশার মধ্যেই বিশ্ববাসীর ও সরকারগুলোর প্রত্যাশা নিহিত আছে: আমরা সম্মিলিতভাবে দাবি করছি যে পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের নীতিতে একটা পরিবর্তন আসতে হবে।

আমাদের হয়তো একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান এনে দেবার মতো ক্ষমতা নেই, কিন্তু আমাদের যার যা ক্ষমতা আছে, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সময় পার হয়ে গেছে। এখন হলো অবস্থান নেবার সময় এবং নিজেদের সংখ্যা গণনার সময়।

, , , , ,

Comments are closed.