বাংলাদেশ নতুন আক্রমণের পরিকল্পনা করছে

দি ডেইলি টেলিগ্রাফ, ১২ জুন, ১৯৭১

নরম্যান কিরহ্যাম, কূটনৈতিক প্রতিনিধি

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

চেকোস্লোভাকিয়া ও চীনের কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের গেরিলারা পশ্চিম-পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। লন্ডনে আসা রিপোর্ট অনুসারে বলা যায়, পরবর্তী দু-মাসে হঠাৎ-আক্রমণের কৌশল নেয়া হবে।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে হাজার হাজার বাঙালি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং গেরিলারা আশা করছে গোপন অস্ত্র-ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আরও অস্ত্র আসবে। গেরিলাদের ব্যবহৃত অনেক হালকা অস্ত্র চেকোস্লোভাকিয়ার তৈরী, কিন্তু ভারতের নাগা এলাকা থেকে কিছু চীনা অস্ত্রও দেশের ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে যেখানে চীন একটি আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনীকে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পাকিস্তানের যুদ্ধে চীনের নীতি হলো ইয়াহিয়া খানের সরকারকে নৈতিক সমর্থন দেয়া এবং নাগা থেকে বেসরকারীভাবে অস্ত্রের সরবরাহ পিকিংকে বিব্রত অবস্থায় ফেলতে পারে।

ব্রিটিশ বন্দুক

বাংলাদেশের গেরিলারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মজুদ থেকে নিয়ে ব্রিটিশ বন্দুক এবং সেইসঙ্গে হালকা মেশিন-গান, মাইন ও হ্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহার করছে। আর নিজেদের তৈরী বিস্ফোরক তো আছেই। তাদের তিনটি হেলিকপ্টার আছে যা এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়নি এবং একটি ফিল্ড-গান আছে; কিন্তু সঙ্গের ভারী যন্ত্রপাতি নেই। তারা বরং চেষ্টা করছে সেনাবাহিনীর সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিতে। তারা গ্রামাঞ্চলে রেলের মালগাড়ি ও সেনা পরিবহনগুলো ধ্বংস করছে। গেরিলারা অনেক জেলা ও প্রদেশের কেন্দ্রগুলোয় নিয়ন্ত্রণ-প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে। অনেক শহরে তারা তাদের নিজস্ব কারফিউ জারি করেছে।

এখন পশ্চিম-পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা অঞ্চলে নতুন আক্রমণের আশংকা করছে। ঢাকা বিমানবন্দরের আশপাশ দিয়ে প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশী অনেক সমর্থক মনে করে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ১০০,০০০ হতে পারে কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অধিক সৈন্য ও সরঞ্জাম আনছে এবং নতুন আক্রমণের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বেসামরিক শাসন-ব্যবস্থা প্রবর্তনের দীর্ঘ প্রতিক্ষীত প্রস্তাবনার গতকালের ভাষণ শুনতে ভালো লাগলেও পূর্ব-পাকিস্তানের আবেগগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। গত তিনমাস ধরে প্রদেশটি সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে, যেজন্য রাজনৈতিক সমাধানের পথ অনেক দূরে সরে গেছে। এই হতাশা ও ঘৃণার মুখে কী প্রয়োজন? অবশ্যই গতকাল দেয়া সতর্ক-প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতির চাইতে উদারতাই বেশি প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণয়নকৃত একটি সংবিধানের চাইতে মহানুভবতা বেশি প্রয়োজন।

বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনাই কাজে দেবে না। কেউ কেউ যদি সহযোগিতা করতে প্রস্তুতও হয় এবং তারা যদি দালাল হিসেবে প্রতিপন্ন হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তাদের কোনো ক্ষমতাই থাকবে না। পূর্ব-পাকিস্তানে প্রেসিডেন্টের বাণীর কোনো অংশ কেউ প্রচার করতে গেলেই সে দালাল হিসেবে আখ্যা পাবে। পূর্ব-পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে এমন কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কথা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। গতকাল ভাষণে এমন কিছু বলা হয়নি যা পোড় খাওয়া মানুষগুলোর মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে।

সন্দেহ নেই, গত তিন মাসে যা ঘটেছে তার জন্য দায়ী করা যায় এমন অনেক লোকই আছে। কিন্তু হতভাগ্য বাঙালিরা অবশ্যই এই দায়ভাগ ভারতকে বা ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে চায় এমন কোনো ‘দুস্কৃতিকারী’কে দিতে চাইবে না। সেনাবাহিনীর কুকর্মের পেছনে কোনো সাফাই প্রেসিডেন্টের বক্তৃতায় গাওয়া হয়নি।

সম্ভবত পাকিস্তানের রাজধানীতে যা চিন্তা করা হচ্ছে তার সঙ্গে পুর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত ঘটনার মধ্যে একটা ব্যবধান রয়েছে। যদি বেসামরিক সরকারকে পুনঃস্থাপন করতে হয় তবে সম্পর্কস্থাপন করা প্রয়োজন। কিন্ত সবেক্ষেত্রেই ঘৃণাকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যে-এজেন্টদের নিয়োগ করা হয়েছে সেই বিহারিদের বাঙালিরা ততখানিই অপছন্দ করে যতখানি তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের করে। এরপরও পূর্বের সমর্থন আদায় করতে পেরেছেন এমন কর্মকর্তারা পশ্চিমে আছে। কিন্তু তারা কি ফিরে যেতে পারেন না? তাদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে এটা কি প্রমাণ করা যায় না যে দমন-পীড়নের নীতি ভুল ছিল? প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটাই ভাবনা এবং তা হলো সবকিছুর সমাধান রাজনৈতিকভাবে হতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত গত তিন মাসে পূর্ব পাকিস্তানে যা করা হয়েছে তার ফলে সমাধানের সম্ভাবনা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এখন যা প্রয়োজন তা হলো বাঙালি জনগণের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা যার ফলে তাদের মনে হবে গেরিলা যুদ্ধ বা অন্য যাবতীয় ভোগান্তি তাদের জন্য আরো যুদ্ধাবস্থাই কেবল আনবে, তার চেয়ে শান্তিপূর্ণ আপসই ভালো হবে। তারা এমন কোনো বিবৃতি দ্বারা অনুপ্রাণিত হবে না যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং যার খসড়া সেনাবাহিনীর জেনারেলদের তৈরি করা বলে মনে হবে।

বাংলায় মহামারি

দি টাইমস, ৬ জুন, ১৯৭১

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

দিনাজপুর সীমান্তে একটি উদ্বাস্তু-শিশু কলেরায় মারা গেল। সীমান্ত-শিবিরগুলোতে এর সংখ্যা ইতোমধ্যে পাঁচ হাজারে উন্নীত হয়েছে। মানচিত্রে প্রদর্শিত উদ্বাস্তুর সংখ্যা থেকে বোঝা যায় আক্রান্তের সংখ্যা মহামারি আকারে অচিন্তনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। কলকাতার লাখ লাখ উদ্বাস্তুকে আঘাত করার জন্য কলেরা খুব দূরে অবস্থান করছে না। গডফ্রে হসন-এর রিপোর্ট।

এক সপ্তাহ আগে বাংলায় নিযুক্ত অক্সফ্যাম-এর মাঠপরিচালক ফরাসী-কানাডীয় রেমন্ড করনইয়ার একটি বার্তা পেয়ে খুব হতোদ্যম হয়ে পড়েন। বার্তাটি আসে ভারতীয় নান মাদার টেরিজার কাছ থেকে কলকাতার দরিদ্রদের নিয়ে যার সেবামূলক কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে; মাদার পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের জন্য কলকাতা থেকে ৭০ মাইল উত্তরে ও বাংলার সীমান্ত-শহর কৃষ্ণনগরে একটি মেডিকেল টিম পাঠিয়েছেন।

বার্তায় বলা হয়েছিল, “প্লিজ, স্যালাইন পাঠান; শিবিরে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে”। বাংলায় এক শতাব্দী জুড়ে কলেরা রয়েছে। কলকাতায় প্রতি বছরে কলেরায় ২,০০০ লোক মারা যায়। কিন্তু স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না, স্বাভাবিক সময়ে এটা কেন ঘাপটি মেরে থাকে। মাদার টেরিজার বার্তার অর্থ হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়ে এটা আবির্ভূত হয়েছে। শিবিরগুলোতে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর অনেকেরই অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে, দূষিত পানি ব্যবহার করছে এবং চিকিৎসা-সুবিধা বঞ্চিত। দেশত্যাগ করে আসা উদ্বাস্তুদের বেশিরভাগেরই পানিবাহিত ব্যাক্টেরিয়ার-মাধ্যমে-ছড়িয়ে-পড়া রোগ প্রতিরোধ করার মতা নেই। গত সপ্তাহের শেষে দেখা দেয়া কলেরার মহামারি আকারে রূপলাভ করাটা নিশ্চিতই ছিল।

কলেরায় আক্রান্তের ভয়াবহ পাতলা পায়খানা হয় ও বমি হয়, যার ফলে মারাত্মক পানিশূন্যতা দেখা দেয়। বমির ফলে তরল খাবার খাওয়া যায় না, তাই স্যালাইন-পানি দেহে ঢোকানোর মাধ্যমে পানিশূন্যতা রোধ করতে হয়। যদি এই পদ্ধতি দ্রুত প্রয়োগ করা যায়, এমনকি এন্টিবায়োটিক ছাড়াই, একজন সবল দেহের লোকের বেঁচে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

মাদার টেরিজার বার্তা পাবার তারা এক ঘণ্টা মধ্যেই করনোইয়ার ও তার সহকারীরা কলকাতা থেকে ৩৫০ বোতল স্যালাইন সংগ্রহ করতে সম হন, এবং কৃষ্ণনগরের উদ্দেশে ট্রাক বোঝাই করে পাঠান। পরের দিন পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রি ডাঃ আবেদিন জানান, প্রতিদিন ১,০০০ বোতল স্যালাইন দরকার কিন্তু সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৮০০ বোতল। এ-পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, প্রয়োজনের তুলনায় সরবরহ কমই রয়েছে।

খাদ্য, ওষুধ ও প্রতিষেধক-এর ঘাটতি

সোমবার পশ্চিম-বাংলার স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিচালক ডাঃ সাহার নদীয়া ও কৃষ্ণনগর জেলার ‘ব্যাপক’ মহামারির কথা বলছিলেন। সপ্তাহান্তে কলেরায় তিনশ পঞ্চাশ জন মারা গেছে বলে সরকারি হিসেব পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার সারা বাংলায় ৯০০ জন মারা গেছে ও বুধবার এই সংখ্যা ১৩০০-তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং এই সংখ্যা কেবল ক্যাম্পসমূহের হিসাব। অর্ধেকে মানুষ ক্যাম্পের বাইরে রয়েছে; এবং যখন ক্যাম্পে এই অসুখ দেখা দেয় তখন ক্যাম্পের বাইরের হাজার হাজার মানুষ ভয়ে ক্যাম্প এলাকা থেকে পালিয়ে যায়, আর সঙ্গে নিয়ে যায় কলেরার জীবাণু।

ভৌগোলিকভাবে রোগজীবাণু যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে ভারতীয় সরকার বলতে চাইছে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের ভেতর থেকে রোগটি বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। বুধবার ইউনিসেফ জানিয়েছে ভারতীয় রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরাতেও কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রাজ্য দু-টি নদীয়া থেকে বহু দূরে অবস্থিত এবং পূর্ব-পাকিস্তানের ভূখণ্ড দ্বারা প্রায় বিচ্ছিন্ন। বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ সরকার অক্সফ্যামের কাছে জানতে চাইছিল ৪০ লাখ কলেরা-প্রতিষেধক দিয়ে কত ভাগ রোগীর চিকিৎসা করানো যাবে। শুক্রবার ভারত-সরকার জেনেভায় অবস্থিত ক্যাথোলিক রিলিফ সার্ভিসেস-এর কাছে আশি টন বিভিন্ন ওষুধ চেয়ে পাঠিয়েছে এবং কলকাতার অক্সফ্যাম-অফিস অক্সফোর্ডে টেলেক্স করেছে প্লেন ভর্তি করে স্যালাইন পাঠানোর জন্য।

স্যালাইন ইঞ্জেকশন ও এন্টিবায়োটিক দিয়েই কেবল কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যদি তা সময়মতো ধরা পড়ে ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা-পরিস্থিতি ন্যূনতমভাবে নিরাপদ থাকে। প্রতিষেধক দিয়েও একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, অবশ্য এ-পদ্ধতি শতকরা ষাট ভাগ ক্ষেত্রে কার্যকর। সুকো ইন্টারন্যাশনালের তৈরী নতুন জেট ইঞ্জেকশন প্রতিষেধক-যন্ত্র দিয়ে গণহারে প্রতিষেধক প্রয়োগ করা সম্ভব। যন্ত্রটি দিয়ে এক ঘণ্টায় একজন চিকিৎসাকর্মী ৪০০ জনকে ভ্যাক্সিন দিতে পারবেন, যেেেত্র যন্ত্রটি ছাড়া একজন ডাক্তারের ঐ পরিমাণ কাজ করতে সারাদিন লেগে যাবে।

বাংলায় এখন বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়েছে। অবশ্য ত্রাণকর্মীরা জানেন যতই বিপুল শোনাক না কেন, প্রয়োজনের তুলনায় তা নগন্য এবং কিছু কিছু এসেছে খুব দেরীতে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ৩০টি জেট ইঞ্জেকশন মেশিন সামনে আসছে; কিন্তু তাতে একটি মাত্র মেশিন দিয়ে দশটি ক্যাম্পের কাজ সারতে হবে। বেশিরভাগ কলেরা-প্রতিষেধক ব্রিটিশদের কাছে রয়েছে যা গতকাল পাঠানো হয়েছে; এই সংখ্যা হলো ৯০৩,০০০। এই সংখ্যার পরও চারজন উদ্বাস্তুর জন্য একটি মাত্র ভ্যাক্সিন বরাদ্দ হবে। আর উদ্বাস্তুরাই কেবল কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে, ব্যাপারটা এমনও নয়।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সব উদ্বাস্তুদের জন্য ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য রেশনের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তার পরিমাণ অবশ্যই বেশি নয়: প্রতি লোকের জন্য প্রতিদিন এক রুপি বা এক শিলিং-এরও কম। প্রায় ৫৫ পয়সা যায় চাল ও ডালের জন্য এবং বাকিটা দিয়ে রান্নার তেল ও জ্বালানি কিনতে। সীমান্ত পার হবার সময় অনেক উদ্বাস্তুই পাঁচ বা ছয়দিন খেতে পায় নি; উপোস করা লোকজনের জন্য এই রেশন ন্যূনতম কিন্তু বাঙালিদের জন্য অনেক। এরকম ঘটনাও ঘটেছে যে ভারতীয় জনগণ অভিযোগ করেছে, সরকার দেশবাসীর চাইতে উদ্বাস্তুদের সবকিছু বেশি দিচ্ছে।

উদ্বাস্তুদের রেশন-গ্রহণের পূর্বে তালিকাভুক্ত হতে হয়। ভারতীয় সরকার তাই জানে উদ্বাস্তুর সংখ্যা কত এবং তারা কোথায় অবস্থান করছে। ত্রাণকার্য বিঘ্নিত হবার পেছনে একটা বাধা হলো উদ্বাস্তুরা পূর্ব পাকিস্তানের আশপাশে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কলকাতার নিচের গাঙ্গেয় সমতল থেকে এক হাজার মাইল উত্তরে, হিমালয় পাদদেশের ভারী বর্ষণের এলাকা আসামী পাহাড়াঞ্চল হয়ে, আবার নিচে বার্মা সীমান্তের বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত উদ্বাস্তুদের অবস্থান।

উদ্বাস্তুরা এই সীমান্ত এলাকা জুড়ে সমানভাবে রয়েছে। জেলা ও রাজ্যসমূহকে ঘড়ির কাঁটার দিকে বিচার করলে গত সপ্তাহের শেষে যেরকম হিসেব পাওয়া গেছে তা হলো, দক্ষিণ-পূর্বের চব্বিশ পরগণা জেলায় ৪২০,০০০ জন; উত্তরের নদীয়া জেলায় ৪৫০,০০০ জন; মুর্শিদাবাদে ১,২০০,০০০ জন, যেখানে গঙ্গাই সীমান্ত হিসেবে কাজ করছে এবং যেখানে পার হওয়া কঠিন; মাদলদহে ৩০০,০০০; এবং পশ্চিম দিনাজপুরের সমতলে ১,২০০,০০০ জন। পূর্ব-পাকিস্তানের উত্তরে কুচবিহারে অন্তঃত ৭০০,০০০ জন উদ্বাস্তু রয়েছে; হিমালয়ের রেলস্টেশন দার্জিলিং থেকে বহু দূরে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বের ভারতীয় রাজ্য আসামে ৩০০,০০০ জন উদ্বাস্তু রয়েছে; মেঘালয়ে আছে ৪৫০,০০০ জন; এবং ভারতীয় রাজ্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত রাজ্য ত্রিপুরায় রয়েছে ৭০০,০০০ উদ্বাস্তু, যে-রাজ্যের নিজস্ব লোকসংখ্যাই ছিল ১,৫০০,০০০ জন।

উদ্বাস্তুদের মোট সংখ্যা এভাবে দাঁড়াচ্ছে অন্তঃত ৪,৬৬০,০০০ জন: কারণ কিছু সচ্ছল লোক কলকাতা বা ছোট শহরগুলোতে প্রবেশ করতে পেরেছে যাদের রেশনের জন্য তালিকাভুক্তির প্রয়োজন নেই। এবং উদ্বাস্তুর সংখ্যা প্রতিদিন ১০০,০০০ করে বাড়ছে। কিন্তু এই বিশাল সংখ্যা পুরো সমস্যার অর্ধেকও নির্দেশ করে না। অনেক পশ্চিমা ত্রাণ-কর্মকর্তা মনে করেন, পূর্ব-পাকিস্তানে একজন হিন্দু অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত এই দেশত্যাগের প্রক্রিয়া চলবে। এই প্রকিয়া শুরু হবার পূর্বে, পূর্ব-পাকিস্তানে মোট হিন্দুর সংখ্যা ছিল এক কোটি।

পূর্ব-পাকিস্তানে সমস্যা শুরু হবার পর থেকে উদ্বাস্তুদের তিনটি ঢেউ সীমান্তে এসে পড়ে। ২৫ মার্চে পশ্চিম-পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আক্রমণ করার পরপরই এক দফায় প্রধানত হিন্দুরা (এবং বাঙালিরাও) উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই প্রথম দফায় কিছু মুসলমানও উদ্বাস্তু হয়। দ্বিতীয় ঢেউটি আসে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে; এবং তৃতীয় ঢেউটি আসে গত সপ্তাহান্তে। উভয় ক্ষেত্রেই উদ্বাস্তুদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। উদ্বাস্তুদের চোখে-মুখে ভয়-ভীতির সব চিহ্নই রয়েছে। দি সানডে টাইমস্ হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড-এর বাংলাভাষী রিপোর্টারদের মাধ্যমে অনেক উদ্বাস্তুর সাক্ষাৎকারের আয়োজন করে।

বর্ষা শুরু হবার পর নতুন বিপদ

সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা-সম্পাদক অভীক সরকার বললেন, উদ্বাস্তুরা “ব্যর্থ বিপ্লবের নিষ্ঠুর স্মৃতি” নিয়ে এসেছে―যে বিপ্লব ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য―এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহিংসতার জন্যও। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ভারতীয় সাংবাদিকরা যেমন বলে থাকে, গণহত্যার এই ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। মি. সরকার লিখছেন, “একটি ভারত-বিরোধী পরিকল্পিত প্রচারণা এখানে চালানো হয়েছে এবং সীমান্ত অতিক্রম করে পালিয়ে না-যাবার কোনো পথ সেনাবাহিনী রাখে নি। নিষ্ঠুরতার একটি বড়ো অংশ হলো হিন্দুদের উদ্বাস্তুতে পরিণত করা”।

প্রতিবেদকরা যা বারবার লিখছেন তার দুটো উদাহরণ পাওয়া গেল। ৮০ বছরের শরৎ দাস বললেন, একদিন তার চল্লিশ বছর বয়েসী ছেলে, যে পেশায় মুচি, কাজ থেকে বাড়ি ফেরে নি। তিনি বললেন তার সন্তানকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। সুধারানি ঘোষ বললেন তার স্বামীকে মুসলিম লিগের কর্মীরা বাড়ি থেকে ডেকে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে। এই কাহিনীগুলো অভিযোগ পুরোপুরিভাবে প্রমাণিত করে না। কিন্তু এগুলো এটা অন্তঃত প্রমাণ করে উদ্বাস্তুরা ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে এবং যতদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় থাকবে ততদিন তারা দেশে ফিরে যাবে না। একজন উদ্বাস্তুকে জিজ্ঞেস করা হলো সে কেন ফিরে যাবে না। সে বলল “আমি তখনই ফিরে যাবো যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হবে।” কোনো সন্দেহ নেই, সে সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্বাস্তুর কথাই বলেছে।

ভারতীয় সরকার সরকারীভাবে তাদের ‘উদ্বাস্তু’ বলার পরিবর্তে ‘স্থানান্তরকারী’ বললেও পুরো ব্যাপারটা থেকে উদ্ভূত সমস্যাকে এড়াতে পারছে না। পাঁচ মিলিয়ন উদ্বাস্তুর কারণে ইতোমধ্যেই প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এরপরও আরো পাঁচ মিলিয়ন উদ্বাস্ত সীমান্ত অতিক্রম করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় সরকারের মনোভাব বাস্তবানুগ না হলেও তা সহজেই বোধগম্য। উদ্বাস্তুরা যে দলে দলে এসেছে তা ভারতের অপরাধ নয়। এসবকিছুর কারণ হলো, পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটেছে তার কারণেই সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। তার চাইতেও বড়ো কথা হলো, পাকিস্তানি সরকার এবং সেনাবাহিনীই এসবকিছুর জন্য দায়ী।

কিন্তু, ভারত-সরকারের ওপরেও নানা দিক থেকে উদ্বাস্তু-সমস্যা নিয়ে নানা ধরনের চাপ রয়েছে, এবং যদি সম্ভব হয়, ভারত-সরকারকে এসমস্যা থেকে মুক্ত হতে হবে। স্থানীয় ভারতীয় জনগণ ইতোমধ্যে অভিযোগ করেছে যে, উদ্বাস্তুরা কাজকর্ম খোঁজা শুরু করে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদরা ইতোমধ্যে সতর্ক হয়ে গেছেন যে, উদ্বাস্তু-শিবিরগুলো হয়ত নকশালপন্থীদের আখড়া হয়ে যাবে; নকশালপন্থীদের কর্মকাণ্ডের নিদর্শনও এরমধ্যে দেখা গেছে― ক্যাম্পগুলোতে রাজনৈতিক খুনোখুনি হয়েছে।

ভারতীয় সরকার এই জনবিস্ফোরণকে মোকাবেলা করার জন্য ব্যাপক পদপে নিয়েছে, যদিও কেন্দ্রীয় বা রাজ্য-সরকারের হাতে সম্পদ খুব সীমিত। বিশেষ করে ত্রিপুরা সরকার বিরাট সব পদপে নিয়েছে: ২৬টি স্থায়ী শিবিরে তারা কাজ করা শুরু করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বেসরকারী ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে যারা ট্রাকের বহর দিয়ে সীমান্ত-শিবিরগুলোতে খাদ্য পৌঁছে দেবে। অক্সফ্যাম ছাড়াও বেশ কিছু বেসরকারী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজ নিজ পদ্ধতিতে কাজ করে যাচ্ছে: পশ্চিমবঙ্গ রেডক্রস, ইউনিসেফ, ওয়ার অন ওয়ান্ট, সেভ দ্য চিলড্রেন ফান্ড, ক্যাথোলিক রিলিফ সার্ভিসেস, দি ক্রিশ্চিয়ান এজেন্সি ফর সোশ্যাল এইড, ক্রিশ্চিয়ান এইড, কেয়ার এবং চার্চসমূহ। কিন্তু বেশিরভাগ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মকর্তারা সম্ভবত রেমন্ড কোরনয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যকে মেনে নেবেন, “স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো যা করছে, তা হলো, একটি বালতিতে এক ফোঁটা পানি”। সংস্থাগুলোর অবদানকে এভাবে হিসেব করা যাবে যে, যখন শত শত ডাক্তারের প্রয়োজন তখন তিনজন এখানে, চারজন ওখানে কাজ করছে; আর যেখানে লাখ লাখ লোক ক্ষুধার্ত, তখন হাজার লোককে খাওয়ানো যাচ্ছে।

দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্বের সরকারগুলো সময়মতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় নি। তিন সপ্তাহ আগেই উ থান্ট জাতিসংঘের উদ্বাস্তু-কমিটিতে জরুরিভিত্তিতে বিশেষ সাহায্য প্রদানের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। জাতিসংঘের দেয় তথ্যানুসারে কেবল চারটি দেশ সাহায্য দিয়েছে বা প্রতিশ্র“তি প্রদান করেছে। আবেদনটির পরপরই ব্রিটেন প্রাথমিক সাহায্য হিসেবে এক মিলিয়ন পাউন্ড প্রদান করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২.৫ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে যার মধ্যে ৫০০,০০০ ডলার ইতোমধ্যে জাতিসংঘ-কমিটিকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। কানাডা ২ মিলিয়ন ডলার প্রদান করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছে খাদ্য- ও স্বাস্থ্য- সংক্রান্ত সাহায্য হিসেবে, এবং পশ্চিম-জার্মানি ১ মিলিয়ন ডয়েস মার্ক দিয়ে শুরু করতে চেয়েছে। জাতিসংঘের অন্য ১৫০টি দেশের কেউই সাড়া দেয় নি― যদিও, সত্যি কথা বললে, সুইডেন সাহায্য দিয়েছে কিন্তু তা দিয়েছে রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে।

রেমন্ড কোরনেয়ার বলেন, “যদি বর্ষা শুরু হয়, আপনি আশা করতে পারেন না যে লোকজন বাইরে খোলা আকাশের নিচে দু-দিন ধরে থাকবে”। লাখ লাখ লোকই খোলা আকাশে নিচে ঘুমায়। উদ্বাস্তুদের মাত্র অর্ধেকই ক্যাম্পের ভেতরে থাকতে পারে। ভরা বর্ষা শুরু হবার আগে আশ্রয়-কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সম্ভবত, কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীরই আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হবার কারণে সেনাবাহিনী সীমান্তগুলো পাহারা দিতে ব্যস্ত রয়েছে। বর্ষা আসার আগে যদি কলেরাকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, মহামারি শুরু হয়ে যাবে; বন্যা হলে বা জলভাগের উচ্চতা বেড়ে গেলে ব্যাক্টেরিয়া দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। এভাবে বর্ষা নতুন একটি বিপদ ডেকে নিয়ে আসবে: সেটা হলো টাইফয়েড। খুব সামান্যই টাইফয়েডবিরোধী সিরাম পাঠানো হয়েছে। বাংলার দুর্ভোগ কেবল বর্ষাতেই থেমে থাকবে না। পূর্ব পাকিস্তানে বর্ষার পূর্বেই ধানের বীজ রোপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ ও দেশত্যাগের কারণে লাখ লাখ কৃষক এই বসন্তে কোনো কোনো ধান চাষ করতে পারে নি। আক্রমণ, নিপীড়ন এবং মৃত্যুর পর চতুর্থ যে অশুভ শক্তি পূর্ব বাংলায় আসবে, তা হলো, দুর্ভিক্ষ।

ত্রাণকর্মীরা অপোকৃত নিকবর্তী বিপদ মোকাবেলায় ব্যস্ত রয়েছে। কলকাতায় কলেরা ছড়িয়ে পড়ছে। এই মারি এমন একটি শহরে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে যার জনসংখ্যা কতো তা কেউ জানে না― এবছরে সম্ভবত আট মিলিয়িন এবং এদশকের শেষে ১২ মিলিয়ন। শহরটির তিন-চতুর্থাংশেই সুয়ারেজ বা চলমান পানি-ব্যবস্থায় ঘাটতি আছে। প্রতি বর্ষায় এখানে জলাবদ্ধতা হয়। ভারতীয় সরকার শহরটিতে কলেরার অনুপ্রবেশে খুবই উদ্বিগ্ন। দমদম এয়ারপোর্টের একেবারে শেষ মাথায় অন্তঃত ৩০,০০০ উদ্বাস্তু এসে আসন গেড়েছে। শহরের আরও কাছাকাছি, উত্তরাংশে অবস্থিত শান্তি-শহরে আরেকটি উদ্বাস্তু-কলোনি আছে যেখানে আরো কয়েক হাজার বেশি উদ্বাস্ত আছে।

শহর থেকে খুব সম্প্রতি ঘুরে আসা অক্সফ্যামের দুর্যোগ-ব্যস্থাপনা-কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার মাইকেল ব্ল্যাকম্যান বলেন, “আমি মনে করি কলকাতায় যদি কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তবে খোদা না করুক, এটা লন্ডনের মহা-প্লেগ হয়ে দেখা দিবে। রেমন্ড করোনেয়ার বলেন, “সে’স্ট উন ফিউ দি ফরেস্ট (এটা হবে দাবানলের মতো)। এটা কতটা ভয়ংকর হবে তা বলার মতো কোনো যথার্থ ভাষা আমার জানা নেই। কলকাতায় ঘিরে যদি এটা একবার ছড়িয়ে পড়ে, উভয় বাংলার গোটা জনগোষ্ঠীই ধ্বংস হবার মুখে পড়বে”। উভয় বাংলায় ১১০ মিলিয়ন মানুষ রয়েছে, যা গোটা মানবগোষ্ঠীর শতকরা তিন ভাগের সমান।

পূর্ব-পাকিস্তানের অপরাধীদের ও ধ্বংসযজ্ঞের ওপর গোপন ক্যাটালগ

দি টাইমস, ৪ জুন, ১৯৭১

পিটার হ্যাজেলহার্স্ট

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক সমস্যাযুক্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গৃহযদ্ধের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও রোগবালাই দেখা দিয়েছে এবং যেকোনো সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হবার আশংকা সৃষ্টি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো, বর্তমান অবস্থা থেকে পরিস্থিতির কেবল অবনতিই হতে পারে। বিশ্বনেতারা অবশ্যই আন্তরিকতার সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন কীভাবে পূর্ব বাঙালিরা এবং পশ্চিম পাকিস্তানীরা একটি ‘রাজনৈতিক সমাধান’-এ পৌঁছতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান-ঘটনাবলীর একজন সবচাইতে উদাসীন ছাত্রও জানেন রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারটি এখন প্রশ্নাতীত একটা ব্যাপার।

সামনের মাসগুলোয় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে এবং বিশ্বের রাজধানীগুলোতে মানুষের তৈরি এই ধ্বংসলীলার বিরুদ্ধে কী কী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া যাবে তা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলবে। কিন্তু এই যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টির জন্য যেসকল ইস্যু রয়েছে সেগুলো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ ও ‘গণহত্যা’ এবং অন্যান্য অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কারণে আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে; এবং এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানী কোনো নেতার দিকে যদি কেউ অভিযোগের অঙ্গুলি তোলেন তবে, বলা যায়, তিনি ঠিক কাজটিই করবেন।

প্রসঙ্গত ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের কথা তোলা যায়, যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত একটি সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবং একটি নির্বাচিত সাংবিধানিক সংসদের লোভ দেখিয়ে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। সংবিধান-প্রস্তুতের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার জন্য এবং পশ্চিম-পাকিস্তানীদের (যারা এক-পাকিস্তানে বিশ্বাস করে ও পূর্ব-পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কারণে যা বিপজ্জনক অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল) ভয় কমাতে, এর আগে প্রেসিডেন্ট একটি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) জারি করেছিলেন যা তাকে সংবিধান অনুমোদন বা বাতিল করার ক্ষমতা দিয়েছিল।

ইতোমধ্যে এটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রি মি. ভুট্টো সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আবির্ভুত হবেন এবং অগ্নিগর্ভ পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান ইতোমধ্যে তার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন তুমুলভাবে চলছে তখন রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, উভয় নেতাই নিজ নিজ প্রদেশে তাদের মাথা খাটানো শুরু করেন এবং পাকিস্তানীরা সামনের দিকে চেয়ে গণতন্ত্রের প্রথম স্বাদ পাবার অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু যখন দুই নেতা তাদের নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেন, এটা দ্রুত পরিস্কার হয়ে গেল যে তারা কঠোর ও বিপরীত দুই অবস্থান থেকে কথা বলছেন; আর সংসদে একই অবস্থান থেকে খুব কমই কথা হবে। মি. ভুট্টোর রাজনৈতিক শক্তি দাঁড়িয়ে আছে কাশ্মীর-বিতর্ক নিয়ে জঙ্গি পাঞ্জাবিদের মোহের ওপর, এবং তিনি পশ্চিমের প্রদেশগুলোতে এই বিষয়টিকেই কাজে লাগাতে শুরু করেন, ভারতের সঙ্গে হাজার বছরের যুদ্ধের কথা বলেন। এবং এই মনোভঙ্গি রক্ষার জন্য তিনি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর কথা বলেন, কাশ্মীরকে স্বাধীন করার জন্য অধিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ভোট চান।

গত বছর দেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ইয়াহিয়া খান ও তার অনুসারীরা নির্বাচনের ফলাফল কী হয় তা নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নিশ্চয়ই মতা হস্তান্তরের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তিনি আশা করেছিলেন নির্বাচনের ফলাফল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের একটি জোট-সরকার গঠন করতে বাধ্য করবে এবং এভাবেই পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা পাবে। কিন্তু জেনারেলরা দু’টি বিষয় বিবেচনায় আনেন নি। শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বামপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নির্বাচন বয়কট করে এবং একারণে আওয়ামী লীগের জন্য পুরো মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়। অন্যদিকে সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান প্রশাসন সময়মতো ত্রাণ সরবরাহ করতে পারে নি বলে ভোট সব আওয়ামী লীগের পক্ষেই যায়, এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রার প্রশ্নে নির্বাচনের ফলাফল ছিল বিপর্যয়মূলক।
প্রায় প্রত্যেক বাঙালিই শেখ মুজিবের ছয়-দফা-কর্মসূচিকে গ্রহণ করেছিল এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ বাঙালিদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে এবং পশ্চিমা প্রদেশের পাঞ্জাব-বিরোধী আঞ্চলিক দলসমূহের সমর্থন নিয়ে ৩১৩টি আসনের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপরে শেখ মুজিব আস্থাবান ছিলেন। পশ্চিমাংশে মি. ভুট্টোর পিপলস পার্টি ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮২টি আসন লাভ করে। পাঞ্জাবি লোকটি এই ভেবে শংকিত হয়ে উঠেছিলেন যে সংসদ বসলে বাঙালিরা তাদের নিজের মতো করে সংবিধান রচনা করবে।

কিন্তু মি. ভুট্টো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রি হতে পারবেন না বুঝতে পেরে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলেন। তিনি হঠাৎ আবিষ্কার করলেন যে প্রেসিডেন্টের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) মধ্যে তার স্বার্থ লুকিয়ে রয়েছে। সংসদকে ভেটো দেবার বা বাতিল করার যে-ধারাটি রয়েছে, তা এক অর্থে পাঞ্জাবেরই ভেটো। নির্বাচনের পরের রাতে এই ধুরন্ধর আইনজীবী আমার কাছে তার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন: ‘আমি কী করব তা নিয় আপনি কী ভাবছেন? শেখ তার সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে তার নিজের সংবিধান রচনা করবে আর সব দায়-দায়িত্ব গিয়ে পড়বে প্রেসিডেন্টের ঘাড়ে। পশ্চিম-পকিস্তানে অগ্রহণযোগ্য কোনো কিছুতে তিনি স্বীকার করবেন কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’

অন্য অর্থে, এলএফও-কে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মি. ভুট্টোর স্বার্থ রয়েছে। কিন্ত তিনি আমাকে বলেন তিনি গোপন খবর পেয়েছেন যে শেখ মুজিব ঘোষণা করেছেন সাংবিধানিক সংসদ অধিবেশনে বসার সঙ্গে সঙ্গে একটি সার্বভৌম সংস্থাতে পরিণত হবে। অন্য কথায় এলএফও এবং পাঞ্জাবি ভেটো তখন থেকে অকার্যকর হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে বাঙালিদের মধ্যে উৎসবের আমেজ চলে এসেছে এবং তাদের দিক থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদের কোনো কর্মকাণ্ড ছিল না। ডিসেম্বরের ২৪ তারিখে ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রি’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং সংসদ ঢাকায় বসার ব্যাপারে সম্মত হন। বাঙালিরা সংসদভবন ও শহরকে সাজাতে শুরু করেছিল এবং ঢাকার মেজাজ ছিল বিশ্রামমুখর। বাংলাদেশের স্লোগান আর দেয়া হয়নি এবং কেউই স্বাধীনতার কথা আর বলছিল না। কিন্তু মি. ভুট্টোর অন্য ভাবনা ছিল। প্রথমে তিনি শিগগীরই সংসদে বসার বিরোধিতা করেন কিন্তু ১৩ ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দেন যে ৩ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে।

কিন্তু দু-দিন পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি ফিরে যাবার ক্ষেত্রে প্রকৃত সমস্যা সৃষ্টি হয়। মি. ভুট্টো ঘোষণা দেন যে তার দল সংসদে যাবে না এবং একইসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের যারা ঢাকা যাবার পরিকল্পনা করছেন তাদের হুমকি দেন। সংক্ষেপে বলা যায় মি. ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে চাপ প্রয়োগ করেন। সাথে সাথে তিনি ইয়াহিয়ার জেনারেলদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যারা পূর্ব-বাংলার ব্যাপারে কট্টরপন্থী। পূর্ব-বাংলার বর্তমান গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানও এদের মধ্যে রয়েছেন।

ইতোমধ্যে অনেক নির্বাচিত পশ্চিম-পাকিস্তানী সাংসদ মি. ভুট্টোর হুমকি উপেক্ষা করে সংবিধান রচনায় অংশ নিতে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকা গিয়েছেন। গাণিতিক হিসেব অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ঢাকার সংসদে জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি মি. ভুট্টো রাওয়ালাপিন্ডি উড়ে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেন, পাঞ্জাবি সেনাবাহিনীর কাছে অগ্রহণযোগ্য কোনো সংবিধানকে অনুমোদন দিলে তাকে ভবিষ্যতে কী কী বিষয় মোকাবেলা করতে হবে। প্রেসিডেন্ট তার ভুলটি করলেন। তিনি পাঞ্জাবি চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন এবং বৃহত্তর দলের নেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে কোনো রকম পরামর্শ না করেই পয়লা মার্চ সংসদ বাতিল করে দেন।

বাঙালিরা দেখল পুরো ব্যাপারটা একটা ষড়যন্ত্র, তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল এবং ঢাকার বিশৃঙ্খলা দমন করতে সেনাবাহিনী তলব করা হল। বাঙালিরা প্রেসিডেন্টের ওপরে আস্থা হারালো এবং ঢাকার রাজপথে বাংলাদেশের জন্য প্রথম চিৎকার শোনা গেল। আওয়ামী লীগের উত্তেজিত সমর্থকরা স্বাধীনতা ডাকা শুরু করে দিল এবং শেখ মুজিব ৭ মার্চের গণবিক্ষোভের দিনে নাটকীয় ঘোষণার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ৬ মার্চ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ঘোষণা দেন ২৫ মার্চ সংসদ ডাকা হবে। কিন্তু ততক্ষণে জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। পরের দিন শেখ স্বাধীনতার জন্য জঙ্গি আন্দোলনের ডাক দেন এবং ভবিষ্যতে কোনো আলোচনার জন্য চারটি পূর্বশর্তের কথা বলেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পূর্বশর্ত ছিল সামরিক শাসন প্রত্যাহার (এলএফও-র কল্যাণে নিশ্চিত মি. ভুট্টোর মতা তাতে শেষ হয়ে যাবে)।

এই ডামাডোলের মধ্যে একটা জিনিস পরিস্কার: অনেক চাপ মোকাবেলা করা সত্ত্বেও শেখ একক পাকিস্তানে অংশ নেবার পক্ষে ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে (বাঙালিরা এক্ষেত্রে ওকালতি করেছিল) কাশ্মীর ইস্যুতে আপস করতেন না এবং তিনি বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিও অগ্রাহ্য করেন যার মাধ্যমে কেন্দ্রের কার্যকর ক্ষমতাকে বাতিল করে দিত। পাঞ্জাব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কারণেই বাঙালিরা সংসদে বেশি আসন পেয়েছিল, কিন্তু পাঞ্জাবিরা বিশ্বাস অর্জন করে যে শেখের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মতো একজন নেতা তারা পেয়েছে।

কিন্তু ভারতের ওপারে বঞ্চিত পূর্বাংশে বিক্ষুব্ধ বাঙালি নেতা এবং তার আওয়ামী লীগের সৈনিকেরা স্বায়ত্তশাসনের জন্য পেশকৃত ছয়-দফার এক ইঞ্চিও ছেড়ে না দেয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শেখ মুজিব এটা পরিস্কার করে বলেছেন যে, যখন তিনি স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেছিলেন তখন তিনি বিচ্ছিন্নতার কথা বলেননি। ‘আমি এই অর্থনৈতিক শোষণ যাতে চিরতরে শেষ হয় তার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা চাই।’ আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী রয়েছে; সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘিষ্ঠদের সঙ্গে কীভাবে পৃথক হয়ে যেতে পারে’ — তিনি সেসময় আমাকে বলেছিলেন। সামরিক শাসনের দ্রুত প্রত্যাহারের দাবিতে অধিক ওজন দেয়ার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে বেসামরিক অসহযোগ-আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সারা প্রদেশের সার্বিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয় এবং বাংলাদেশের দাবি ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হতে থাকলে প্রেসিডেন্ট ১৬ মার্চ দু-টি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে ঢাকায় উড়ে যান: (১) তিনি বলেন তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে শিগগীরই ক্ষমতা ছেড়ে দিবেন যদি শেখ উভয় প্রদেশে প্রাদেশিক পর্যায়ে প্রাদেশিক জাতীয় সরকার গঠন করেন, অথবা (২) তিনি প্রদেশগুলোতে ক্ষমতা দিবেন এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে যার প্রধান হবেন তিনি স্বয়ং এবং এই সরকার একটি সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত দেশের প্রতিদিনকার কাজ চালিয়ে নেবে।

সেসময় দুই নেতা বলেছিলেন আশার কথা এখনও আছে। কিন্তু মি. ভুট্টো ইতোমধ্যে প্রস্তাবগুলো শুনেছেন এবং জনসম্মুখে ঘোষণা করেন যদি কোয়ালিশন সরকারে পিপলস পার্টিকে অন্তর্ভুক্ত না করা হয় তবে পশ্চিম-পাকিস্তানে আগুন জ্বলবে। তার কথার প্রমাণস্বরূপ তিনি পাঞ্জাবে ব্যাপক সহিংস বিক্ষোভ করেন এবং ২১ মার্চ অন্যান্য পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করার জন্য ঢাকায় চলে আসেন। যখন প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবকে জিজ্ঞেস করেন কেন্দ্রীয় কোয়ালিশন সরকারে পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে ভুট্টোকে নিতে প্রস্তুত আছেন কি না, শেখ তখন গণতান্ত্রিক রীতির কথা বলেন এবং জানান একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে সহযোগী হসেবে তিনি কাকে নেবেন না নেবেন তা পছন্দ করার অধিকার তাকে দিতে হবে। এখানেও বোঝা যাচ্ছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বিষয়ে শেখের অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রমাণ করে তিনি বিচ্ছিন্ন হবার পরিকল্পনা করছিলেন না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পুনরায় মি. ভুট্টোর জোর হুমকির কাছে নতি স্বীকার করেন এবং কোয়ালিশন সরকারের প্রস্তাব এভাবে বাতিল হয়ে যায়।

সময় পার হয়ে যাচ্ছে দেখে শেখ এবং ইয়াহিয়া দ্বিতীয় আপস-ফর্মুলায় রাজি হন: প্রাদেশিক পর্যায়ে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর। শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সামরিক শাসন তুলে নেবার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আদেশ জারি করার জন্য এবং পূর্ব বাংলায় ও পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশে ক্ষমতা দেবার জন্য বলেন। শেখ মুজিব একটি সংবিধান রচিত না হওয়া পর্যন্ত একটি প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাষ্ট্র-পরিচালনার বিষয়টি মেনে নিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানের ভাগ্য অন্যান্য শক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। মি. ভুট্টো সেনাবাহিনীর কট্টর জেনারেলদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন এবং পূর্ব-বাংলার রাজপথের আন্দোলন মুজিবের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে।

সৈন্যরা ব্যারাকে যুদ্ধের পোশাক পরে ফেললে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা ঢাকায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে শুরু করে। প্রেসিডেন্টকে পূর্ব-বাংলায় আগুন জ্বালাবার সিদ্ধান্ত নিতে ভুট্টোই বাধ্য করেন। মি. ভুট্টো প্রেসিডেন্টকে বোঝান সামরিক শাসন তুলে নিলে, প্রদেশে ক্ষমতা প্রদান করা মাত্র পাকিস্তান পাঁচটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যাবে। তিনি আশংকা প্রকাশ করেন যে মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয় সরকারকে শেষ করে দিতে চায়। সামরিক শাসন তুলে নিলে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে থাকতে আর কোনো অবস্থা থাকবে না। অর্ধ-প্রভাবিত হয়ে প্রেসিডেন্ট আবার মুজিবের কাছে যান এবং আশংকাগুলো প্রকাশ করেন। তিনি মুজিবের কাছে প্রতিজ্ঞা করেন জাতীয় সংসদ বসলে ও কেন্দ্রীয় সরকারকে এক ধরনের মূল্য দেয়া মাত্র তিনি সামরিক শাসন তুলে নেবেন। শেখ মুজিব দ্রুত সামরিক শাসন তুলে নেবার কথা পুনরায় দাবি করলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপলব্ধি হয় যে তিনি একজন বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে কথা বলছেন এবং পুনরায় তার জেনারেলদের দলে চলে যান।

যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছতে চাইলে বলা যায়, বর্তমান হত্যাযজ্ঞের দায়-দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ওপরই পড়ে, যখন তিনি বাঙালিদের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই সংসদ বাতিল করে দেন, কিন্তু মার্চের ৩ তারিখে মি. ভুট্টো সংসদ বয়কট করলে তার ঘাড়ও অধিক দায়-দায়িত্ব গিয়ে পড়ে।

যুদ্ধ শুরু হয়েছে

দি টাইমস, ২ জুন, ১৯৭১

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

বাংলাদেশের নির্বাসিত নেতারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে শেষ-দেখে-নেয়া-যুদ্ধের কথা বলছেন

কলকাতা, ১ জুন। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার এবং বিধ্বস্ত দেশটির বামপন্থী বিরোধীদলসমূহ আজ পশ্চিম পাকিস্তানীদের সঙ্গে যেকোনো প্রকার সমঝোতার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি এ. এম. কামরুজ্জামান এবং প্রধান বিরাধীদলীয় নেতা মাওলানা ভাসানী উভয়েই ইয়াহিয়া খানের সাধারণ মার সুযোগকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সংবাদপত্রসমূহকে দেয়া তথ্যবিবরণীতে তারা বলেছেন এটা হলো শেষ-দেখার-যুদ্ধ। কামরুজ্জামান বলেছেন, ২৫ মার্চের রাতে সেনাবাহিনীর হত্যালীলার পর প্রেসিডেন্টের কোনো কথাই পূর্ব-পাকিস্তানে আর বিশ্বাস করা হবে না। এই বাঙালি নেতার মতে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আগের দিনই প্রকৃত অর্থে বাঙালিদের দাবিকে মেনে নিয়েছিলেন এবং বেতারে তা ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কামরুজ্জামান বলেন, ‘কিন্তু তা না-করে তিনি বাঙালি জাতিকে সমূলে উৎপাটনের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে আমাদের কাছে জেনারেল ইয়াহিয়া খান নামটি মানুষের পদবাচ্য কিছু মনে করা হয় না। নামটি একজন রক্তপিপাসু খুনী, একজন বিশ্বাসঘাতক এবং একজন পাকিস্তান-বিচ্ছিন্নকারীর প্রতীক হিসেবে পরিচিত। নিরীহ নাগরিক ও শিশুদের হত্যা করার পর আমাদের মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক-পাকিস্তানের ছাদের নিচে থাকা সম্ভব নয়’। অতি-বাম বাঙালি-নেতা মাওলানা ভাসানী আজ সাংবাদিকেদের বলেন বামপন্থী বা ডানপন্থী কোনো বাঙালিই পশ্চিম-পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় যাবে না। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা ভাসানী পূর্ব-পাকিস্তানকে সহায়তা দানে ব্যর্থ হবার জন্য সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের সমালোচনা করেন।

কয়েক সপ্তাহের নিরবতার পর আজ আন্ডারগ্রাউন্ড-রেডিও-স্টেশন ”স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” জানিয়েছে যে মুক্তিযোদ্ধা-গেরিলারা পশ্চিম-পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে পরাজিত করেছে। ৫৫০-রও বেশি নিয়মিত সৈনিক নিহত হয়েছে এবং একটি গানবোটকে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। বেতার-কেন্দ্র জানিয়েছে উত্তর-পূর্ব-অঞ্চল সিলেট স্বাধীন হয়েছে, তিনটি প্রধান রেলওয়ে-ব্রিজ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সৈন্যরা ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশত, সহজ প্রতারণা ও সহজ উত্তেজনাসাধ্য বাঙালিদের নায়কোচিত যুদ্ধ এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে পিছু-হটানো ও পরাজিত করার কাহিনী হলো, সম্ভবত, আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের মতোই — উর্বর-কল্পনাপ্রসূত সংবাদ। বাঙালিদের প্রত্যাশাকে ইচ্ছাপ্রণোদিতভাবে খাটো মনে না করেই আমি আজ সকালে একটি রেডিও-সিগনাল-এর দিক খোঁজার কয়েল দিয়ে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে প্রচারিত হচ্ছে’ দাবি-করা রেডিও-স্টেশনটির দিক খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। আমাকে বিস্মিত করে দিক-খোঁজার কয়েলটি জানালো যে শক্তিশালী, স্পষ্ট বেতার-সম্প্রচারটি বাংলাদেশের দিক থেকে আসছিল না, আসছিল উত্তর দিক থেকে, যে-একই দিক থেকে অল-ইন্ডিয়া-রেডিও সম্প্রচারিত হচ্ছে। কলকাতা শহরের অন্যান্য স্থান থেকে ব্যাপারটি পরীক্ষা করা হলে বারবার উত্তর দিককেই খুঁজে পাওয়া গেল, যেদিকে চিনসুরা এবং মাগরা অবস্থান করছে এবং যেখান থেকে অল-ইন্ডিয়া-রেডিও সম্প্রচার করা হয়।

অবশ্য এখানে এটা বলা হচ্ছে না যে, মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঘাঁটিসমূহে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে কোনো ধরনের আক্রমণ করছে না। তবে এটা বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি সীমান্তে বাংলাদেশ-ধারণাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ভারতীয় সরকার। প্রায় প্রত্যেক বাঙালি রাজনৈতিক নেতা ভারতে পালিয়ে গেছেন। মাওলানা ভাসানী সম্ভবত কলকাতায় নিরাপত্তা-হেফাজতে রয়েছেন, অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রি তাজউদ্দিন আহমেদ এবং তার পরিবারও ভারতীয় কোনো অঞ্চলে অবস্থান করছেন। আঁতুড়ঘরেই মৃত জাতীয় সংসদের সদস্যরা ব্যস্তসমস্তভাবে কলকাতা-দিল্লী করছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন উপদেষ্টা, আইনজীবী, ডাক্তার ও শিকদের একটি দল এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে পূর্ব-বাংলার ৭ কোটি অধিবাসী এখন নেতৃত্ববিহীন ও হতোদ্যম হয়ে পড়েছে।

এ-পরিস্থিতিতে, এতে কোনো সন্দেহ থাকে না বাংলাদেশ যদি স্বাধীনতা লাভ করে ও যখন স্বাধীনতা লাভ করবে, এর কার্যকর নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল্স্-এর সাবেক অফিসারদের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিবাহিনীর হাতে চলে যাবে। বর্তমানে ভারতীয় প্রশিকদের সহায়তায় মুক্তিবাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা সীমান্তের ৩০টি ক্যাম্পে ৩০,০০০ আগ্রহী যোদ্ধাদের প্রশিণ দিচ্ছেন। একইসঙ্গে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে ভারতীয় সেনা-বিশেষজ্ঞেদের পরামর্শক্রমে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের আঘাত করছে।

সব সীমান্তেই গেরিলারা সৈন্যদের বেশ ভালোভাবেই হেনস্থা করছে বলে ক্রমশ জানা যাচ্ছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, তারা পশ্চিম-বাংলা, আসাম এবং ত্রিপুরার সীমান্তে অবস্থিত ছোট ছোট পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ক্যাম্পসমূহে ঝটিকা আঘাত করে ফিরে আসছে। তৎক্ষণাৎ বা পরবর্তী সময়ে যখন পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের গেরিলাদের সীমান্ত বরাবর তাড়া করছে, শেষ পর্যন্ত তাদের ভারতীয় সৈন্যদের মুখোমুখি হচ্ছে।

আমাদের দিল্লী-প্রতিনিধি জানাচ্ছেন: ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রি স্মরণ সিং আজ সংসদে বলেছেন, ভারত ব্রিটেনসহ বিভিন্ন বিদেশী সরকারদের চাপ প্রয়োগ করছে এই বলে যে পাকিস্তানের ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে পুনর্বাসিত করার জন্য যেকোনো সাহায্য ‘বাংলাদেশে বিরাজ-করা নিপীড়নমূলক পরিস্থিতিকে অস্বীকার করা হবে’। সদস্যরা যখন মি. সিংকে বাংলাদেশের প্রাদেশিক সরকারের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের মনোভঙ্গিকে অসম্মত করার জন্য জোরপ্রয়োগ করার উদ্যোগ নেন, তিনি কেবল ব্রিটিশদের কথাটিরই পুনরাবৃত্তি করেন: ‘দেশটির জাতীয় বিষয় নিয়ে নয়, কেবল সাহায্যের নীতিই এখানে নেয়া হয়েছে’।

মুজিব ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি

দি গার্ডিয়ান, ১৩ মার্চ, ১৯৭১

মার্টিন এডনে

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

ঢাকা, মার্চ ১২। শেখ মুজিব আজ ঘোষণা দিয়েছেন যে পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে একবার ও শেষবারের মতো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। যে-দলটি পূর্ব বাংলার সত্যিকারের সরকার হিসেবে কাজ করছে সেই আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব আমাকে বললেন: ‘আমি ব্যাপারটা সমাধা করতে আলোচনায় বসতে রাজি আছি। আমি যা বলেছি, পষ্ট করেই বলেছি। আমার নাগরিকেরা স্বাধীন নাগরিক হিসেবে একটি স্বাধীন দেশে বাস করতে চায়।’ ব্যাপারগুলো বিস্তারিতভাবে জানতে চাইলে, যেমন প্রতিরক্ষা বাজেটের ব্যাপারটা — যা আলোচনার একটি বিষয় হতে যাচ্ছে, তিনি বলেন: ‘দ্বিধাগ্রস্ত হবার আর কোনো সুযোগ নেই, আমি আমার জনগণের রক্তের বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না।’ তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে চান কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন: ‘তারা যদি আমাদের অংশ হিসেবে থাকতে বলে, তবে ভাইয়ের মতো একসঙ্গে থাকাই ভালো হবে।’

মুজিব বাঙালিদের ঐক্যের কথা জোর দিয়ে বলেন — যে-ঐক্য গত সপ্তাহজুড়ে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি দাবি করেন তাদের মগ্নতা ও নিয়মানুবর্তিতা দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে তাদের সাহায্য করবে। তিনি অভিযোগ করেন পূর্ব বাংলার সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে উপনিবেশের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। সৌদি আরব ও চেকাস্লাভিকিয়া থেকে পাঠানো হেলিকপ্টার বাঙালিরা কখনো দেখে নি। বন্যা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সহায়তার সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ‘রাতদিন কাজ করেছে এমনকি কোনো খাবার ছাড়াই’ এবং তিনি যদি বলেন তো ছাত্ররাও মাঠ পর্যায়ে যাবে। তিনি বলেন: ‘আমরা একটি নিয়মানুবর্তী জাতি; আপনি কি তা লক্ষ করেন নি?’

তিনি জোরারোপ করেন যে যদি রোববারের জনসভায় সেনাবাহিনী তাদের বিপে নামতো তবে জনগণ তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত ছিল। ‘আমাদের জনগণ মৃত্যুকে বরণ করে নেবে। তারা প্রতিদিন ঘুর্ণিঝড়ে, বন্যায়, কলেরায়, অনাহারে মারা যায়। আমরা আরেক বার মরবো এবং সবার জন্য মরবো।’ পূর্ব পাকিস্তানের মর্যাদা যদি পরিবর্তিত হয় তবে তার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বমতের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি স্পষ্টতই সচেতন।

পাকিস্তানের অখণ্ডতা রায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধাবস্থান নেয়া ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় ছাপা হওয়া একটি প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানকার একটি পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়েছে। এখানকার অর্থনীতি সংকটে পতিত হবার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ বাণিজ্যিক বিনিময়ের ওপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা খানিকটা শিথিল করেছে। দীর্ঘণ ব্যাংক খোলা রাখা অনুমোদন করা হয়েছে, অর্থ বিনিময় ও মাল খালাসের সীমা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পণ্য পরিবহণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের জন্য সপ্তাহে ১০,০০০ রুপি পর্যন্ত অর্থ গ্রহণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপকে সব ধরনের কাজ চালিয়ে যাবার জন্য বলা হয়েছে। শিল্পোন্নয়ন কর্পোরেশনের কারখানাগুলো চালু হয়েছে এবং কৃষিজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কাজ চালিয়ে যাবার জন্য বলা হয়েছে।

রয়টার্স-এর সংযুক্তি: প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আজ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকার পথে করাচিতে আসছেন। প্রেসিডেন্ট তার যাত্রা গোপন রেখেছেন। ওদিকে ঢাকার ১৭২ মাইল পশ্চিমে একটি জেলখানায় দাঙ্গা বেধে গেলে রীদের গুলিতে দু-জন বন্দি মারা গেছে এবং ২২ জন আহত হয়েছে। লোহার রড ও অন্য অস্ত্রের আঘাতে ৩০ জন পুলিশও আহত হয়েছে। গতকাল রাতে বরিশাল জেলে ২০০ জন বন্দি রীদের ওপরে চড়াও হলে দাঙ্গা বেধে যায়। পুলিশ বলেছে বন্দিদের জেলখানার মূল গেট ভেঙ্গে ফেলার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্য থেকে ২২ জন জেলখানার উঁচু দেয়াল অতিক্রম করে পালিয়েছে। বর্তমান আন্দোলন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তানের জেলখানা থেকে প্রায় ৩৮৫ জন বন্দি পালিয়েছে।

টুকরো হয়ে যাবার আশংকা, পাকিস্তানের স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন

দি টাইমস, ১০ মার্চ, ১৯৭১

জেড. এইচ. জাইদি

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

পাকিস্তানের দু-অংশের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা কি অবশ্যম্ভাবী? আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস্ পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলি ভুট্টোর মধ্যে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা দেখে অনেক পর্যালোচকের মনেই এখন এই প্রশ্ন। ভুট্টোর আইনসভার অধিবেশন বয়কটের অবিচণ হুমকি, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা পূর্বে তৎপরবর্তী বিক্ষোভ-আন্দোলনের ফলেই এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা থেকে পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

দুই অংশের বৈরিতা নতুন কিছু নয়। দেশভাগের পর থেকেই বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি। ভাষা থেকে তারা এর শক্তি পেয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চাইলে তা প্রতিরোধে যারা আত্মত্যাগ করেন তাদের স্মরণ এই জাতীয়তাবাদের শক্তির উৎস। শেষ পর্যন্ত উর্দুর পাশাপাশি বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়, কিন্তু তা অর্জিত হয় রক্তপাতের মাধ্যমে। বিলম্বে প্রদান করা অধিকার বাঙালিদের ক্ষোভ খুব কমই প্রশমিত করতে সমর্থ হয়।

ভাষা-বিতর্ক পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে দ্রুত বেড়ে ওঠা অনুভবের নির্দেশক। তারা মনে করেছে আগে তারা মাড়োয়াড়ী ও পশ্চিমবঙ্গের জোয়াল কাঁধে নিয়েছে, এখন নিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানীদের। দেশভাগের সময়ে অবিভক্ত ভারতে পুরো বেসামরিক প্রশাসনে মাত্র একজন পূর্ব বাংলার মুসলমান কর্মকর্তা ছিলেন। আর ১৯৫৬ সালের পর থেকে পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনে কঠোর কোটা-পদ্ধতিতে লোক নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনে পূর্ব পাকিস্তানের তিনজন যুগ্ম সচিব, ১০ জন উপ-সচিব এবং ৩৮ জন নিম্ন সচিব রয়েছেন। এর বিপরীতে ঐ পদগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যা যথাক্রমে ৩৮, ১২৩ ও ৫১০। বিভাগপূর্ব সময়েই সামরিক বাহিনীতে পাঞ্জাবী ও পাঠানদের প্রাধান্য ছিল, বিভাগপরবর্তী সময়ে তাদের প্রাধান্য আগের চাইতে আরও বেড়েছে। ১৯৫৬ সালের পর থেকে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি ঘটেছে কিন্তু বৈষম্য থেকেই গেছে।

বেসামরিক, রাজনৈতিক ও সামরিক — ক্ষমতার এই তিন হাতিয়ারের সমাবেশ ঘটেছে পাকিস্তানের তিনটি শহরে, কিন্তু শহর তিনটিই পাঞ্জাব রাজ্যে অবস্থিত। এতে আন্তঃঅংশ বিরোধ বেড়েছে। ১৯৫৫ সালে সিন্ধু, বেলুচিস্তান, সীমান্ত প্রদেশ ও পাঞ্জাব মিলে একটি অংশের সৃষ্টি হবার পর লাহোর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজধানী হয়। ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খানের একক সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদে নিয়ে আসেন। এতে দেশের রাজধানী হয় পাঞ্জাবেরই একটি শহর। রাওয়ালাপিন্ডি তো সশস্ত্রবাহিনীর হেডকোয়ার্টার ছিলই।

আইনসভায় এক ইউনিট ব্যবস্থা কেবল আন্তঃপ্রদেশ বিরোধ বাড়িয়েই তোলে নি, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে পরস্পরের শত্রুভাবাপন্ন করে ফেলেছে। দেশভাগের পরপরই যে-আইনসভা গঠিত হয়েছিল সেখানে ৬৯টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিল ৪৪টি। নতুন পদ্ধতিতে এই প্রতিনিধিত্ব পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা নির্ধারিত হতো। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সম্প্রতি এই ইউনিট পদ্ধতি ভেঙ্গে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেন। তার উদ্যোগ মোতাবেক প্রতিটি প্রদেশ তার জনসংখ্যার ভিত্তিতে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করবে। এভাবে ৩১৩টি আসনের জাতীয় আইনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগ প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষোভের কিছু যথার্থ কারণ আছে। কিন্তু এর সবটাই পশ্চিম পাকিস্তানের কারণে হয় নি। ইতিহাস ও ভূগোল সেখানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা এনে দিয়েছে। ভারত বিভাগের পূর্বে পূর্ব বাংলা ছিল সবচেয়ে অনুন্নত এলাকার একটি। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়িত অঞ্চলের জন্য কাঁচামালের যোগানদার-ভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পূর্ব বাংলার রফতানি-কেন্দ্র চট্টগ্রামকে প্রতিদ্বন্দ্বী কলকাতার কারণে অনুন্নত রাখা হয়েছে। পূর্বের জেলাগুলো পুরোপুরিভাবে অবহেলা করা হয়েছে ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। এই অবস্থা দূর করতে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের উদ্যোগে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়। কিন্তু এই বিভাগ স্বল্পস্থায়ী হয়। বাঙালি হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং ১৯১১ সালে আবার বাংলা এক হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে আবার তারা পৃথক হয়ে যায়। আজ দু-অংশই উত্তাল। নিকট ও দূর ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে তা বলা কঠিন। কিন্তু ভারতের একটি অংশ হতে এর কোনো ইচ্ছা নেই। ঐধরনের একত্রীকরণের অসুবিধা কী তা স্পষ্ট। পাকিস্তানে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু ভারতে তারা হবে সাত ভাগের এক ভাগ। পাকিস্তানে তারা অর্থনৈতিক সম্পদের একটি বড়ো অংশের ভাগ পেতে পারে, কিন্তু ভারতে সম্পদের ভাগ পেতে অন্যান্য অনেক অঞ্চলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এর নতুন পাটকলগুলোকে কলকাতার কলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে, কলকাতা বন্দরের সঙ্গে উন্নয়নশীল চট্টগ্রাম বন্দরকে মোকাবেলা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে একত্রিত বাংলার আত্মপ্রকাশও একটা ফলাফল হিসেবে কেউ ভাবতে পারেন, কিন্তু তা হবার সম্ভাবনাও খুব কম। ১৯৪৭ সালে শরৎ চন্দ্র বসু ও সোহরাওয়ার্দি এরকম একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু তা কার্যকর হয় নি। কিন্তু পূর্ব বাংলা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে লীন না হবার ব্যাপারে খুবই সচেতন। আর এধরনের একত্রীকরণ করতে হলে পশ্চিমবঙ্গকে ভারত থেকে পৃথক হতে হবে — কিন্তু এধরনের যেকোনো উদ্যোগ ভারত শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবে।

পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একমাত্র বিকল্প হলো পূর্ণ স্বাধীনতা অথবা পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে শিথিল ফেডারেশন। পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান নেতৃত্ব স্বাধীনতার ক্ষেত্রে খুব আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। পূর্ব পাকিস্তান ব্যাকুলভাবে যেটা চাচ্ছে সেটা হলো তারা নিজেরাই নিজেদের শাসন করবে — তারা চায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। নিজ শাসন বা স্বরাজ যাই বলুন না কেন, তারা তাই করতে চায়, যদি সম্ভব হয় তবে পশ্চিম পাকিস্তানের সহযোগিতা নিয়েই। যদি পূর্ব পাকিস্তানীদের নিশ্চয়তা দেয়া হয় যে তাদের ঘরের তারাই প্রভু, তবে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে ফেডারেল সরকারব্যবস্থায় অংশ নেবে। সেখানে দুর্বল কেন্দ্র থাকতে হবে এবং কেন্দ্র তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তপে করবে না। ভারত একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র কিন্তু একটি সংবদ্ধ ভূখণ্ড। পাকিস্তান একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র কিন্তু বিভক্ত ভূখণ্ড। এই দুই রাষ্ট্রেরই ভবিষ্যত হলো শিথিল ফেডারেল কাঠামোর। উভয় দেশকেই আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক চেতনাকে সত্যিকারের মর্যাদা দিতে হবে এবং দু-দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দেশবিভাগ হয়েছিল মুসলমান-অধ্যুষিত প্রদেশগুলোর ওপরে হিন্দু আধিপত্যের ভয় থেকে। পূর্ব পাকিস্তানের ওপরে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য একইভাবে অমীমাংসিত প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৪৭ সালের পূর্বের পাকিস্তান-আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের দাবির মিল রয়েছে। হিন্দির আধিপত্যের বিপরীতে উর্দুকে রক্ষা, আইনসভায় ও চাকরিতে মুসলমানদের অংশভাগ, কংগ্রেসের শক্তিশালী কেন্দ্রের পক্ষে মতের বিপরীতে মুসলমানদের ফেডারেল কাঠামোর দাবি এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের আরও ক্ষমতার দাবিসহ অনান্য কিছু কারণই ছিল ভারতবিভাগের কারণ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী মুসলিম লীগ আইনসভা বয়কট করেছিল। ইতিহাস কি তার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে?

[ড. জাইদ লন্ডন ইউনিভার্সিটির প্রাচ্য ও আফ্রিকা অধ্যয়ন স্কুলের ইতিহাসের প্রভাষক।]

পুরনো পাকিস্তানের সমাপ্তি

দি টেলিগ্রাফ, ১০ মার্চ ১৯৭১

ডেভিড লোশাক

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

ঢাকা। ভারতীয় উপমহাদেশে দেশবিভাগের কোলাহলের মধ্যে জন্ম নেয়া, অযোগ্য রাজনীতিবিদ ও অপরিণামদর্শী জেনারেলদের মাধ্যমে খুঁড়িয়ে চলা, জিন্নাহ-সৃষ্ট, ইসলামের প্রতি অনুরক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন মৃত। গত দুই সপ্তাহের দৃশ্যপট ও নিপীড়নমূলক রাজনীতির পর বলা যায় পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে যাওয়াটাই সমাধান হতে পারে। ১২ কোটি পাকিস্তানীর, বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের শোষিত ৭ কোটি বাঙালির দুঃখজনক অতীতের চাইতে মলিন ভবিষৎ অপেক্ষা করছে।

শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণআন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার ফলে যে-সংকট সৃষ্টি হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারকে তা বিপদে ফেলে দিয়েছে। আর যদিও হবার কথা নয় তবু, রক্তপাত ছাড়াই, কোনোক্রমে তার সমাধান হতে পারে। কিন্তু বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের নেতারা যে আপসরফাই করে থাকুন না কেন, দুই জাতিকে একত্রে রাখার যে-নিরীক্ষা করা হয়েছে, তা ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ একটি সত্য যে এখানে দুই জাতি রয়েছে। এদের কোনো সাধারণ স্বার্থ নেই, কোনো পারস্পরিক নির্ভরতা নেই, কোনো সাধারণ ভাষা বা খাদ্যাভ্যাস নেই এবং এমনকি ইসলামও তাদের একত্রে রাখতে পারে না।

শেষ যে-বিষয়টি বোঝার দরকার তা হলো, ইসলাম কোনো ঐক্যের শক্তি নয়। এটা মধ্যপ্রাচ্যে প্রমাণিত হয় নি; এখানেও হচ্ছে না।

ভারতীয় শত্রুতা

দেশটির দুই অংশের মধ্যে অনেক পার্থ্যক্যের সঙ্গে, যার অনেকগুলোই মীমাংসা করা সম্ভব নয়, যোগ হয়েছে এই ভৌগোলিক সত্যটি: দু-টি অংশ এক হাজার মাইলের শত্রুভাবাপন্ন ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন। দুই অংশের মধ্যে আকাশপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গত মাসে ভারত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এই পরিস্থিতির আরও অবনমন ঘটে। কোনো আধুনিক রাষ্ট্রই — অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে এবং সবচেয়ে বড়ো কথা ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে — টিকে থাকতে পারে না। পাকিস্তানের নেতারা ২৩ বছরের উদ্বিগ্ন সময়ে স্থিতিশীল, স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করতে ব্যর্থ হবার পেছনে এগুলোই হলো কারণ। একই কারণে পাকিস্তান সবসময়ই রোগগ্রস্ত থেকেছে। কিন্তু এর সমাধান হিসেবে পাকিস্তান দু-টুকরো হয়ে যাচ্ছে যা আবার আগের রোগের চেয়েও মারাত্মক। এখন দীর্ঘদিনের সংঘাত ফুটন্ত কড়াইয়ের পানির মতো ফুটছে, নেতাদের ফিরে আসার আর কোনো উপায় নেই।

দু-জন পাকিস্তানী এবং তার বন্ধুরা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ এই বিভক্তির জন্য দায়ী। গত ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসবকিছু ঘটছে। বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা দেবার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ফর্মুলা খুব মসৃণভাবে ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান কার্যত পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই প্রথমবারের মতো পূর্ব পাকিস্তান সরকারব্যবস্থায় তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। এটাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। নির্বাচন অযোগ্য রাজনীতিবিদ ও হঠকারী জেনারেলদের জবাব দেয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও গরীব মানুষের মিলিওনার নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো ‘ইসলামিক সমাজতন্ত্র’-এর কথা বলে পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮৫টি আসন লাভ করেন। বাঙালিদের প্রিয় জননেতা শেখ মুজিবুরের দল আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ টি আসনের দু-টি ছাড়া সব আসনই লাভ করে। নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের ইস্যুর আবেগকে কাজে লাগিয়ে মুজিব এই সাফল্য পান। এভাবে তিনি ৩০০ আসনের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।

এর পরে মনে হয়েছিল রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নে সম্মত হবেন যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দৃশ্যপট থেকে সরে যাবেন। এক্ষেত্রে আদর্শগত দিক থেকে তাদের বিভক্তি কম ছিল, এবং উভয় নেতাই সংবিধান-ইস্যুতে আপস করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কেবল দুই-দল-ব্যবস্থাই তৈরী করে নি, এটা এমন এক দুই-দল-ব্যবস্থা করে যাতে জনসংখ্যার কারণে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষমতাসীন পশ্চিম পাকিস্তানকে শাসন করবে এবং বিরোধী দল কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এই ফলাফল দুই অংশের মধ্যে পার্থক্য তৈরী করে।

নিজেদের মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং উপনিবেশ ঠেকাতে পূর্ব পাকিস্তান প্রায় পুরোমাত্রার স্বায়ত্তশাসন চাচ্ছে যা আওয়ামী লীগের ‘ছয় দফা’-র ভিত্তিতে চাওয়া হচ্ছে। এর অধীনে নিজেদের রাজস্ব ও ব্যয়, বৈদেশিক সাহায্য, বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিজেদের অধীনে থাকবে এবং কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি, এবং সম্ভবত মুদ্রা একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে। পশ্চিম পাকিস্তানে এই প্রস্তাব ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। এটা মি. ভুট্টোর কাছে গৃহীত হয়নি — কেবল এজন্য নয় যে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাতে ব্যাহত হবে — আরও একটি ব্যাপার হলো, তার দর্শন অনুসারে ভারতের সঙ্গে হাজার বছরের যুদ্ধ চালাতে হলে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার দরকার।

ইয়াহিয়ার কাছেও এটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। তার মনে হয়েছে এতে পাকিস্তানের সংহতি নষ্ট হবে। এটা পাঞ্জাবী-প্রাধান্যের-সেনাবাহিনীর কাছেও গৃহীত হয় নি। তারা পূর্ব পাকিস্তানে গণতন্ত্র দিতে চায়, কিন্তু তা এমন কোনো গণতন্ত্র নয় যে, বাঙালি-সংখ্যাগরিষ্ঠতার সেনাবাহিনীবিমুখ সরকারের প্রতি চিরদিনের জন্য তাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। আর এটা অগ্রহণযোগ্য ছিল অন্য রাজনৈতিক কারণে। এরকম স্বায়ত্তশাসন পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশকেও অনুপ্রাণিত করবে এবং পাকিস্তানের সংহতি আরও সংকটের মুখে পড়বে। তাই আইনসভা বসার আগেই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

ভুল পদ্ধতি

এরকম গুরুতর সময়ে ইয়াহিয়া ভুল পথে এগোলেন। ইয়াহিয়া আইনসভার অধিবেশন স্থগিত করলে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। এক সপ্তাহের আন্দোলনের পর তিনি ২৫ মার্চ অধিবেশনের নতুন তারিখ ঘোষণা করেন, কিন্তু তার বেতার ভাষণ শুনে বাঙালিরা তার ইচ্ছার সামঞ্জস্য খুঁজে পায় নি। জেনারেলের চাইতে তিনি সার্জেন্ট মেজরের স্টাইলে পদক্ষেপ নেয়ায় তা পূর্ব পাকিস্তানের অধৈর্য জনতাকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয় এবং স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’-এর ঘোষণা দেয়া থেকে বিরত থাকার মতো কিছু বলে তাদের আশ্বস্ত করতে পারেন নি। রোববারে শেখ মুজিব এই ঘোষণার কাছাকাছি চলে এসেছেন, সেনাবাহিনীর তড়িৎ ও কঠোর প্রতিক্রিয়া ছাড়াই তিনি এটা করতে পারতেন। সেনাবাহিনী যেকোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতার আন্দোলনকে প্রতিহত করবে, এর অর্থ অনেক রক্ত ঝরবে।

যদি ‘বাংলাদেশ’ স্বাধীনতা লাভও করে, তবে তার নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে হবে এমন একটি অর্থনীতি থেকে যা ইতোমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত। কিন্তু যদি একে প্রতিহত করা হয় বা দমন করা হয়, তবে ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে কীভাবে হজম করা যাবে? আর দখলদার বাহিনী দিয়ে একটি জাতিকে কীভাবে দমিয়ে রাখা যাবে, যে-বাহিনীর ঘাঁটি এক হাজার মাইল দূরে? যদি পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তবে পশ্চিমেও একইভাবে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হবে, অর্থনৈতিক অবস্থা সেখানেও ভালো নয়।

পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবালী ভারতের সমস্যা-রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও গভীর প্রভাব ফেলবে। মার্কসীয় নেতা জ্যোতি বসু তার নিজস্ব ‘ছয় দফা’ দাবি করে দিল্লি থেকে পৃথক হতে চাইছেন। এসব হচ্ছে কেবল এজন্য নয় যে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় বেশ কিছু চীনা ‘পর্যবেক্ষক’-কে দেখা যাচ্ছে।

৭ই মার্চের ভাষণের পরে

দি টাইমস, ৮ মার্চ, ১৯৭১

পল মার্টিন

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক


আপস অথবা সরাসরি সংঘাত: পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিধাগ্রস্ত

ঢাকা, মার্চ ৮। আজ পাকিস্তানের সংকট নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে। কারণ দেশটির উভয় অংশকেই আজ রাজনৈতিক আপস অথবা সরাসরি সংঘাতের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়ার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বক্তৃতা দিয়েছেন, তা থেকে মনে হচ্ছে আপসের কিছু সুযোগ এখনও রয়েছে। তিনি বলেছেন ২৫ মার্চে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আইনসভায় বসতে রাজি হবার ক্ষেত্রে সামরিক সরকারকে অন্তঃত চারটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে। গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে যে-উত্তেজনা দেখা গিয়েছে, তা এখনও বলবৎ রয়েছে কিন্তু এরপরও শ্বাস ফেলার সময় তৈরী হয়েছে। বিপদের কথা এই, উভয় পক্ষের সামরিক ও বেসামরিক জঙ্গীরা বিশেষত পূর্বের মুজিববাদী চরমপন্থী ছাত্ররা সংকটকে পুনরায় চরম গভীরে ঠেলে দিতে পারে।

পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যত যে অনিশ্চিত তা বোঝা যাচ্ছে বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে যারা দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী তাদের ফিরে যাবার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রথম ব্যাচ হিসেবে জার্মানীদের একটি দল, যাদের মধ্যে দূতাবাসের স্টাফ ও পরিবার রয়েছে এবং কর্মরত অন্যরা আজ ব্যাংককে চলে গেছেন। ব্রিটিশদের মধ্যে দেশে ফিরে যাবেন তাদের জন্য একটি বোয়াক ভিসি টেন এয়ারলাইন অপো করছে আগামীকাল ঢাকা ছাড়ার জন্য। যদিও সবাইকে চলে যাবার ঘোষণা দেয়া হয় নি, তবুও কোনো সরকার সতর্ক হবার প্রয়োজন মনে করছে। বিগত সপ্তাহগুলোর ব্যাপক মিছিল-বিক্ষোভে থেকে অবশ্য বিদেশীদের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি দেয়া হয় নি। কিন্তু যেহেতু আইন-কানুন পরিস্থিতি ভালো নয়, তাই এই মনোভাব যে পরিবর্তিত হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বাঙালিদের জন্য ইস্যুটি খুব পরিস্কার: শেখ মুজিবুর ও তার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যেতে দিতে হবে, যারা পরিস্কার সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে নির্বাচনে জিতেছে, অথবা নির্বাচনটিই প্রহসনে পরিণত হচ্ছে। শেখ পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র কার্যকর শক্তি বলে এতোকিছু সম্ভব হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে শেখের অবস্থান সাংঘাতিক ভালো। ৩ মার্চের সংসদীয় অধিবেশন স্থগিত করার পর আওয়ামী লীগের ডাকে ঢাকায় হরতাল পালিত হচ্ছে।

যদিও প্রদেশজুড়ে প্রয়োজনীয় সেবা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, কিন্তু সব সরকারী-বেসরকারী অফিস, স্কুল ও ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকবে। রাজস্ব প্রদান স্থগিত থাকবে, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ থাকবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না-দেয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে চালু পশ্চিম পাকিস্তানের একাউন্ট বন্ধ থাকবে। শেখ পশ্চিমের সঙ্গে যে-অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছেন, এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা তৈরি করবে। বাঙালিরা বিশ্বাস করে যেহেতু তাদের বেশিরভাগ উৎপাদিত পণ্য পশ্চিম থেকে আসে, তাই বাণিজ্য বন্ধ হলে তারা এর প্রভাব হাড়ে হাড়ে টের পাবে।

শেখ আরেক জায়গায় জয়ী হয়েছেন। তার অসহযোগ আন্দোলন কাজে দিচ্ছে। ব্যপারাটা বোঝা গেল, যখন গতকালের বিশাল জনসভায় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন ঢাকার বেতারকেন্দ্র তা প্রচার করতে রাজি হলো। কিন্তু সময়মতো তা সম্প্রচারিত হয় নি। বিক্ষোভকারীরা এর প্রতিবাদ জানায় এবং বেতারকেন্দ্রে ঘরে-তৈরী-বোমা নিক্ষিপ্ত হয়।

পাকিস্তান: ভাঙ্গন রোধে ইয়াহিয়া সেনাবাহিনী ব্যবহার করবেন

দি অবজারভার, ৭ মার্চ, ১৯৭১

সিরিল ডান

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্তাল কেন্দ্র ঢাকা আজ যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তার ফলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারে। এর ফলে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে স্বাধীনতা লাভের ২৫ বছর পর দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেতে পারে। পূর্ব পাকিস্তানের ৫০-বছর-বয়সী রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল ঘোষণা করেছেন যে আজ ঢাকার পল্টন ময়দানে একটি গণসমাবেশে করবেন। তার আন্দোলনের সেনাপতিরা বলছেন আজ মুজিব একটি ‘ঐতিহাসিক বক্তৃতা’ করবেন, যার অর্থ পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেবেন।

এই সম্ভাবনার কথা বুঝতে পেরে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান — যিনি এখনও সামরিক শাসক হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ মতা ধারণ করেন — গতকাল দুপুরে এক বেতার-ভাষণে দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে তিনি পাকিস্তানের ভাঙ্গন বরদাশত করবেন না। তিনি তার ভাষণে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক হস্তপে করতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যাই ঘটে থাকুক না কেন যতণ পর্যন্ত আমি পাকিস্তান-সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্বে আছি, পাকিস্তানের সম্পূর্ণ ও পরম অখণ্ডতা রা করবো। এবিষয়ে যেন কোনো সন্দেহ কারো মনে না থাকে। আমি সামান্য কয়েকজন লোককে কোটি মানুষের পাকিস্তান ভূমিকে ধ্বংস করার সুযোগ দিতে পারি না’।

একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আজ ঢাকায় চরম বিক্ষুব্ধ প্রদর্শনীকে রোধ করার জন্য ও পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করার জন্য দু-টি পদপে গ্রহণ করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নির্বাচিতরা ২৫ তারিখে একটি সংবিধান প্রণয়নের জন্য আইনসভার অধিবেশনে বসবেন। সংবিধান অনুসারে মতা সেনাবাহিনীর হাত থেকে জনগণের কাছে হস্তান্তরিত হবার কথা। ডিসেম্বরের ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি আসনেই জয়ী হন কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো সমর্থনই পান নি।

শেখ যখন পুরো পাকিস্তানের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এমন এক ধরনের স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা দিতে চাইলেন যার প্রকৃতি স্বাধীনতার চেয়ে সামান্য দূরবর্তী একটি অবস্থান, তখনই বর্তমান সংকট তৈরী হলো। এর ফলে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রি ও পশ্চিমাংশে বিজয়ী পিপলস্ পার্টির প্রধান মি. জুলফিকার আলি ভুট্টো প্রথম জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশন বয়কট করেন। এর পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ‘অনির্দিষ্টকাল’-এর জন্য অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন এবং এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পূর্ব পাকিস্তানে তাৎণিকভাবে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও হত্যার ঘটনা ঘটে। মৃতের সংখ্যা কত তা কঠোর সেন্সরশিপের কারণে তাৎণিকভাবে জানা যায় নি, তবে গত শুক্রবারে একটি এজেন্সি-প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিতে ২,০০০ লোক মারা যায়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গতকাল এটাও ঘোষাণা করেছেন যে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পূর্ব পাকিস্তানে যাচ্ছেন। পদপেটি সাহসী, এমনকি বেপরোয়াও বলা যায় একে। পূর্ব পাকিস্তানে এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ইয়াহিয়ার পূর্বসূরী ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়েছিল। এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে যাবার মাধ্যমে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছেন। তিনি যদি সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতবাদীরা ‘সামান্য কয়েকজন’ তবে শিগগীরই তিনি দেখতে পাবেন যে তার জানার মধ্যে গলদ আছে।

এটা শোনা যায় যে সংকট সৃষ্টি হবার পর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আড়াই ডিভিশন সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করছে। তার পর থেকেই এর সংখ্যা বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১০০০ মাইলেরও বেশি ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন।

এটা শোনা যায় যে সংকট শুরু হবার পর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আড়াই ডিভিশন সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করছে। তার পর থেকেই সৈন্যসমাবেশ ক্রমশ বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১০০০ মাইলের ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পূর্বে দু-জন কাশ্মিরী ভারতীয় এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে লাহোরে নিয়ে যাবার পর থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পাকিস্তানী বিমান চলাচলের ওপর ভারত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পাকিস্তানের বিমানগুলোকে তাই পুরো ভারত-সীমান্ত ঘুরে শিলং-এর পথ ধরে আসতে হয়। ভারতীয় প্রতিরামন্ত্রি জগজীবন রাম বলেছেন পাকিস্তানের সংকট সত্ত্বেও এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। শেখ মুজিবুরের স্বায়ত্তশাসিত পূর্ব পাকিস্তানের পরিকল্পনায় স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীর কথাও রয়েছে। অবশ্য তার অস্তিত্ব এখনও নেই, আর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কেবল একটি রেজিমেন্টেই পূর্ব পাকিস্তানী সদস্য রয়েছে।

গতকাল লন্ডনে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় শেখ মুজিবুর “এখনও একক পাকিস্তানের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন”, কিন্তু “পুরো জনগোষ্ঠীর চাপ রয়েছে যে তিনি যেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে ‘জাহান্নামে যাও’ বলে বিদায় করে দেন”। শেখ সবসময় বলে এসেছেন যে পূর্ব পাকিস্তান “পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অবহেলিত উপনিবেশ এবং তার স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা এই শোষণ থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে মুক্ত করবে”।

আমাদের প্রতিনিধি মৃতের সংখ্যা ‘প্রায় ২০০’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং জানাচ্ছেন এই সংখ্যাটি প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম কারণ সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যদিও পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র বিক্ষুব্ধ জনতা কারফিউ ভঙ্গ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। শেখ তার জনগণকে শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন এবং তার নির্দেশ না-দেওয়া পর্যন্ত তারা যেন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ না-করে ও পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এই মুহূর্তে বাঙালিরা অবশ্য শেখ যা বলবেন তা যাই হোক না কেন করতে রাজি আছে। কিন্তু তাদের মেজাজ বিগড়েও যেতে পারে যদি তিনি তাদের প্রত্যাশা পূরণ না করেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন যে সেনাবাহিনী অস্ত্র ব্যবহার করছে। দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন ‘বাংলার নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে’ নগ্নভাবে সেনাবাহিনীকে ব্যাবহার করা হচ্ছে। বিােভ আরও ছড়িয়ে দেবার জন্য তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের কাছে ‘অবিলম্বে’ পূর্ব পাকিস্তানে সেনাভিযান বন্ধের দাবি জানানোর আবেদন জানিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে তারা ‘দখলদার বাহিনীর মতো’ আচরণ করছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ওপরে ‘উৎপীড়ন’ বন্ধ করতে ইয়াহিয়ার ওপরে চাপ প্রয়োগের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি অনুরোধ করেছেন এমন তথ্য ভারতীয় বেতার আকাশবাণীতে প্রচার হবার পর তা অস্বীকার করেছেন।

জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ইয়াহিয়া খান বলেন ডিসেম্বরে পাকিস্তানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার পর ‘আমি জনগণের কাছে মতা হস্তান্তরের জন্য যতগুলো পদপে গ্রহণ করেছি তার প্রতিটি কয়েকজন নেতার জন্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে’। তিনি বলেন তিনি অধিবেশন স্থগিত করেছেন পরিস্থিতি শান্ত হবার জন্য, কিন্তু তার এই পদপেকে ‘পুরোপুরিভাবে ভুল বোঝা’ হয়েছে। তিনি বলেন পূর্ব পাকিস্তানের গণ্ডগোল থামাবার জন্য তিনি সর্বনিু সংখ্যায় সেনাবাহিনী ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে ‘আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ও আল্লাহর ওপরে ভরসা রেখে একটি গণতান্ত্রিক জীবনপদ্ধতির দিকে এগিয়ে যাবার’ আহ্বান জানান।

নির্বাচনের পর থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন ভারতবিভাগের আগে, যখন ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, তখনই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছিল কিন্তু পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘প্রতারণা’ করা হয়েছে। তিনি বলেন ১৯৪০ সালের মার্চে মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবে ‘স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের’ কথা বলা হয়েছিল যেখানে রাষ্ট্রগুলো হবে ‘স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম’।

জাতীয় পরিষদ বসলে যে নতুন সংবিধান প্রণীত হবার কথা সেখানে শেখ যিনি সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি কেন্দ্রের হাতে কেবল পররাষ্ট্র ও প্রতিরা রাখতে চান। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে রাজস্ব ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কেন্দ্র কোনো খবরদারি করতে পারবে না। তার মতে এই দুইটি ক্ষেত্রে বিশেষত পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক ‘শোষিত’ হয়ে এসেছে। শেখ ইতোমধ্যে ইয়াহিয়ার সঙ্গে একমত হয়েছেন যে প্রাদেশিক রাজস্বের আনুপাতিক একটি অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরা-বাজেটে চলে যাবে। কিন্তু বাঙালিদের প্রবল আপত্তি ঐখানে যে তাদের রাজস্বের ৭০ ভাগই সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র ও মুদ্রাবিনিময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

তারা ক্ষুব্ধ এজন্য যে ৩০০,০০০ সৈন্যের পাকিস্তান বাহিনীকে পোষার জন্য তাদের রাজস্ব ব্যয় করতে হয়। আর সেই সেনাবাহিনীর প্রধান কাজ হলো কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে সংঘাতে নিয়োজিত থাকা। কিন্তু কাশ্মির বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের মতো সংশ্লিষ্টতা বোধ করে না। উপরন্তু বাংলা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে খুবই আগ্রহী যা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর থেকে বন্ধ হয়ে আছে। যদিও অনেক ভারতীয় পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়েই খেদ ব্যক্ত করে থাকে কিন্তু পাকিস্তানকে দু-টি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে তাদের আপত্তি নেই। ভারতের সরকারী পর্যবেণ হলো যদি পাকিস্তানের নতুন জাতীয় পরিষদে মুজিবুর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পে নেতৃত্ব দেন তবে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যাবে।

ভারত এটাও বিশ্বাস করে যে পূর্ব পাকিস্তান যদি ভেঙ্গে আসে তবে তার অর্থনৈতিক অবস্থার সম্ভবত আরও অবনমন হবে। সেক্ষেত্রে এখনকার জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যর্থতা চিহ্নিত হতে পারে। স্থানীয় সমাজতন্ত্রীরা এতে অস্থির হয়ে উঠবে এবং একসময় পশ্চিমবঙ্গের শক্তিশালী সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে তারা জোট বাঁধতে চাইবে। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা খুব একটা উজ্জ্বল নয়। একসময়ে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের বৈদেশিক আয় পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আর সেরকম নেই। পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্বের চাইতে সফলভাবে শিল্পায়ন ঘটানো হয়েছে। ‘ঔপনিবেশিক শোষণের ত্রে’ পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প প্রায় পুরোপুরি পাটের ওপরে নির্ভরশীল।

পূর্ব পাকিস্তান হলো পৃথিবীর মধ্যে প্রথম এলাকা যেখানে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের বাস্তবতা নির্মম আকারে দেখা দিয়েছে। এখানে প্রতি বর্গমাইলে ১,৩০০ জন মানুষ বাস করে ও প্রতি বছর এর এক-তৃতীয়াংশ ভূ-ভাগ বন্যায় প্লাবিত হয় এবং অধিবাসীদের অন্যত্র বসতি স্থাপনেরও সুযোগ নেই। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ মনে করেন যেমন আছে, এঅবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের এককভাবে এগিয়ে যাবার ক্ষমতা নেই।

পাকিস্তানের নির্বাচন মি. ভুট্টোকে পশ্চিমে নেতৃত্ব আনছে এবং পূর্বে শেখ মুজিবুরকে বিজয়ী করছে

দি টাইমস, ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭০

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

একটি বিস্ময়কর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয়ের মাধ্যমে পকিস্তানের প্রথম অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো পশ্চিমের একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত হয়েছেন। পশ্চিমাংশে নতুন সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে যেখানে ধরা হয়েছিল মি. ভুট্টোর সোশ্যালিস্ট পিপলস পার্টি ৩০টি আসন পাবে, সেখানে তারা পশ্চিমের ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসন লাভ করেছে। মি. ভুট্টো ১১৯টি আসনে তার প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন এবং তার দল আশা করছে সবগুলো আসনের ফলাফল প্রকাশ হলে আরো ২০টি আসন লাভ করে শীর্ষে অবস্থান করবে।

পূর্ব প্রদেশে জাতীয়তাবাদী দল আওয়ামী লীগ, যেমন আশা করা হয়েছিল, বাংলার জন্য নির্ধারিত ১৬২টি আসনের মধ্যে ইতোমধ্যেই ১৪৫ আসন লাভ করেছে। এভাবে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যদিও পশ্চিমের কোনো সমর্থনই তারা পাবে না। একইভাবে ভুট্টোর অনুসারীরা পশ্চিম পাকিস্তানেই সীমাবদ্ধ, পূর্বে সমর্থনের কোনো আশা বা চেষ্টা তারা করেনি।

এই দু’জন আঞ্চলিক নেতা পকিস্তানের সব ইস্যুতে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন এবং নির্বাচনের এই ফলাফল পকিস্তানকে সম্পূর্ণ দু’টি পৃথক রাজ্যে বিভক্ত করে ফেলবে বলে মনে হচ্ছে। মি. ভুট্টো ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’র ব্যানারে তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে এক হাজার বছরের যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা করেছেন এবং পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে বেশিরভাগ আসন পেয়েছেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেও তিনি সমর্থন অর্জন করতে পেরেছেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চূড়ান্ত ফলাফল আসছে এবং এটা পরিস্কার যে ভুট্টো পাঞ্জাবের ৮২টি আসনের মধ্যে অন্তঃত ৬২টি আসন পাবেন এবং নিজ প্রদেশ সিন্ধুতে ২৭টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসন পাবেন। এছাড়া তিনি নিজে যে-ছয়টি আসনে দাঁড়িয়েছিলেন তার পাঁচটিতেই তিনি জিতছেন। যে কাউন্সিল মুসলিম লীগকে ভাবা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, মিয়া মুমতাজ দৌলতানার সেই দলটির ভরাডুবি হয়েছে। যে ৫০টি আসনে তারা প্রতিযোগিতা করেছিল তার মধ্যে তারা মাত্র ৭টি আসন পাচ্ছে। বিস্ময়করভাবে ডানপন্থী কট্টর দল জামাত-ই-ইসলামী খুবই খারাপ ফলাফল করেছে এবং বাম ধারার ধার্মিকের দল হাজারভি জামাত উলামা ইতোমধ্যেই পাঁচটি আসন লাভ করেছে।

নির্বাচনে অংশ নেয়া অন্যান্য ২৩টি দলের প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। কিছু বিখ্যাত নেতা তাদের নিজস্ব নেতৃইমেজের কারণে নিজ নিজ এলাকায় জয়লাভ করেছেন। এদের মধ্যে আছেন পাকিস্তান গণতন্ত্রী দলের বিখ্যাত নেতা নূরুল আমিন, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মিয়া মুমতাজ দৌলতানা ও আব্দুল ওয়ালি খান। তবে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান, যিনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পিপলস পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাওয়ালাপিন্ডিতে পরাজিত হন।

এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ক্ষমতাবান আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। দলটির জনপ্রিয়তা দাঁড়িয়ে আছে প্রধানত তার পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী অবস্থান এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের প্রতিজ্ঞা থেকে। তবে এখানে একটি ব্যাপার ছিল যে, আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পিকিংপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এভাবে শেখ মুজিবের মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়। দলটি এখন গত সপ্তাহে বাতিল হয়ে যাওয়া ঘুর্ণিঝড়-দূর্গত বাকি নয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

রাওয়ালাপিন্ডি, করাচি, পেশওয়ার ও পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলে কিছু বিচ্ছিন্ন সংঘাতের ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সহিংসতা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন এক অর্থে পাকিস্তানে উত্তেজনা কমিয়ে দিয়েছে কিন্তু অন্য অর্থে দেশটিতে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

পাকিস্তানের নতুন রাজনৈতিক প্রতিনিধিবর্গকে জাতীয় পরিষদে প্রথম দিন বসার পর থেকে ১২০ দিন সময় দেয়া হবে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ও সাংবিধানিক সংসদের চেহারা যা দাঁড়াচ্ছে তা থেকে মনে হচ্ছে সে-প্রক্রিয়া থেমে যাবে। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ জন প্রতিনিধি এরকম একটি সংবিধানের জন্য লড়াই করবেন যা প্রদেশগুলোর সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন দেবে। শেখ মুজিব যদি সংসদে তার দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন তবে কেন্দ্রীয় সরকারকে তার প্রতিরা ও পররাষ্ট্র ছাড়া সব ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে।

তিনি এরকম একটি সংবিধান চাচ্ছেন যা বাঙালিদের তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য নিজস্ব পছন্দকে যাচাই করার সুযোগ নিশ্চিত করবে। এর ফলে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে। অন্যদিকে ভুট্টো ক্ষমতাধর কেন্দ্রীয় সরকার সমর্থন করেন এবং তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ দাবিরই বিরোধিতা করবেন। তাই দুই নেতা সমঝোতায় আসতে পারবেন কিনা সেব্যাপারে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।