সমস্যাটা কোথায়?

দি ইকোনমিস্ট, ২৮ নভেম্বর, ১৯৭০

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

১২ ও ১৩ নভেম্বরের সাইক্লোন পাকিস্তানের আবহাওয়াবিদদের অসতর্ক রাখেনি। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ২৫০ মাইল বেগে আঘাত হানার আগের দিন কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকার পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও রাডার স্টেশনগুলো তাদের কাজ করে যাচ্ছিল। আমাদের পাকিস্তান-প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে আবহাওয়াবিদরা ১৬ ঘণ্টা পূর্বে ‘হারিকেন ডেঞ্জার’ সতর্কবার্তা এবং তার আট ঘণ্টা পরে ‘হারিকেন গ্রেট ডেঞ্জার’ সতর্কবার্তা ইস্যু করেছিলো। কেউ সেটা শোনেনি কেন? আংশিকভাবে এটা হল সেই বালকের গল্প যে নেকড়ে এসেছে বলে চিৎকার করতো। তিন সপ্তাহ আগে ২৩ অক্টোবরে একই অঞ্চলে কম ক্ষমতাম্পন্ন আরেকটা সাইক্লোন আঘাত করেছিলো। সেসময় রেডিও সম্প্রচার বন্ধ রেখে বারবার সাইক্লোনের পূর্বাভাস জানানো হয়েছিলো এবং উপকূলবর্তী লোকজনকে উঁচু স্থানের সরে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। সেবার সাইক্লোন সীমিত কিছু অঞ্চলে আঘাত হেনেছিলো এবং মাত্র ৩০০ জন মারা গিয়েছিলো। মৃতের হার পূর্ববর্তী বিপর্যয়ের তুলনায় কমই ছিলো। কিন্তু ১২ নভেম্বরে সতর্কবার্তা প্রচার করা সত্ত্বেও গতবার যারা বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিলো তারা আবার বাড়ি ছেড়ে যেতে চায়নি।

কিন্তু অফিসিয়াল অসতর্ককতা ও অবহেলাও ছিলো। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ২৫০ মাইল বেগে ঘুর্ণিঝড় ধেয়ে আসার চিত্র পাবার পরে দু’ভাবে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিলো: সমুদ্রজাহাজের জন্য চালনা সমুদ্রবন্দরে সর্বোচ্চ ১০ নম্বর মহাবিপদসংকেত ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে সর্বোচ্চ ৯ নম্বর মহাবিপদসংকেত এবং জনগণের জন্য একটি বর্ণনা পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু উপকূল থেকে দূরবর্তী দ্বীপসমূহের কাছে সাইক্লোন চলে আসার পর বিপদসংকেত প্রত্যাহার করে নেয়া হয় এই ভেবে যে, জাহাজসমূহ ইতোমধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে গেছে। সতর্কবার্তা সাধারণ আবহাওয়া-প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছিল এবং অনুষ্ঠানসমূহ যথারীতি প্রচার হচ্ছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের অনেকেই বিষয়টিকে ততটা ভয়াবহ ভাবেনি।

সাইক্লোনের এমন গতি আগে দেখ যায়নি; দিক পরিবর্তন করে এবং শক্তি সঞ্চয় করে এটি পূর্ববঙ্গের উপকূলে ২৪ ঘণ্টা আগে আঘাত হানে। কিন্তু এই অপ্রত্যাশিত আঘাতের পরেও সাইক্লোনের সঙ্গে ধেয়ে আসা জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা এবং গভীরতা পরিমাপের ব্যর্থতার কোনো ব্যাখ্যা আবহাওয়াবিদরা দেননি। চট্টগ্রামের ভূ-কম্পন-পরিমাপ স্টেশন জলোচ্ছ্বাসের উপরিভাগের রেকর্ড পরিমাপ করতে সমর্থ হয়েছিলো।

পাকিস্তানের একটি হিসেব মতে, যদি জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস দেয়া হতো তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অন্তঃত অর্ধেক কম হতো। জলোচ্ছ্বাসের আঘাতের বারো ঘণ্টা পরে যখন অনেক লোক ইতোমধ্যে মারা গিয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের আবহাওয়া-বিশারদরা প্লাবিত দ্বীপ হাতিয়া থেকে দুর্যোগের ওয়ারলেস-বর্ণনা বন্ধ করে দেন ‘ফেব্রিকেশন’ হিসেবে। তারা ভুল ধারণা নিয়ে ছিরলন যে, স্বল্প উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস রাত্রি শেষে দেখা যাবে। কিন্তু সত্য হলো পূর্ণিমার কারণে বঙ্গোপসাগরে উঁচু ঢেউয়ের জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো।

এখন সবাই অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে — আবহাওয়াবিদরা প্রাদেশিক সরকারকে, সরকার স্থানীয় এজেন্সিকে এবং স্থানীয় এজেন্সি আবহাওয়া অফিসকে। দায়িত্বে অবহেলা করা সেসব লোকদের কেউ কেউ তাদের দোষ এভাবে ঢাকছিলো যে, সাইক্লোন আঘাত করার আগের ঘণ্টায় তারা অনুপস্থিত থাকার কারণ, সারাদিন রোজা রেখে তারা ইফতারি করতে গিয়েছিলো। সাইক্লোন আঘাতের ২৪ ঘণ্টা পরেই কেবল দুর্যোগের প্রকৃত মাত্রা বোঝা গিয়েছিলো। শনিবার সকালে ঢাকার একটি পত্রিকা লিখল ‘শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়’। ১৪ তারিখেই মৃতের সংখ্যা অনুমানভিত্তিতে বলা হয়েছে ২০০,০০০। কিন্তু মৃতের সংখ্যা সঠিকভাবে ও যাচাই করে ঘোষণা দিতে অনেক সময় লেগেছে। ১৩ তারিখে সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা বলা হযেছে ৫০ হাজার। তখন থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসেব দ্রুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৫,০০০-এ। সরকারি হিসেবে ক্রমে সত্যের ছোঁয়া লাগায় পশ্চিম পাকিস্তান এবং সারা বিশ্ব ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো কী ধরনের ধ্বংসলীলা চলেছে।

ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক সাহয্য ছিলো মাত্র ৩০,০০০ পাউণ্ড। এই পরিমাণ পরে বেড়ে দাঁড়ায় এক মিলিয়ন পাউণ্ডে। একটি প্রকাশিত আবেদনপত্রে আরো এক মিলিয়ন পাউণ্ডের আশা করা হয়েছে যা ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ত্রাণ-উদ্যোগ। লীগ অফ রেডক্রস সোসাইটি এবং জাতিসংঘের কাছে সাহায্যের জন্য পাকিস্তানের আবেদনের পর ভালো সাড়া পাওয়া গিয়েছে — বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের কাছ থেকে। প্রথম সমস্যা ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে দ্রুত সাহায্য পাঠানো। সাহায্যের পরিমাণ ভালোই ছিলো; এবং তার বিরাট অংশ ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু আংশিকভাবে সেখানে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছতে অনেক সময় লেগে যায় — ঢাকা এয়ারপোর্টে অবতরণ করতে দেরি হবার কারণে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ প্রথমে বাণিজ্যিক ফ্লাইটগুলো বাতিল করতে রাজি হয়নি।

জীবিত সব দুর্গতদের জন্য এখন যথেষ্ট পরিমাণ খাবার, কাপড় ও পরিচর্যার সংস্থান ঢাকায় প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু তার খুব সামান্যই গত সপ্তাহের শেষে রেডক্রসের মাধ্যমে দুর্গতদের পৌঁছেছে। ত্রাণসামগ্রী বহনকারী সব প্লেন দ্রুত এয়ারপোর্টে নামতে সরকারকে রাজি করাতে বেশ সময় লেগে যায়। উপদ্রুত ব-দ্বীপে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ একটি বিরাট মাথাব্যথার বিষয়। ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া হাতেগোনা কয়েকটি রাস্তায় এখন নরম পলি জমে আছে এবং জলপথে চলাচলকারী প্রায় সব নৌকাই ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন খুব প্রয়োজন হেলিকপ্টারের এবং ইঞ্জিল-চালিত নৌকার। কিন্তু পাকিস্তান আর্মি বা এয়ারফোর্সের কাছে তা যথেষ্ট আছে বলে মনে হচ্ছে না।

একটি সামরিক সরকারের জন্য এ-ধরনের মহাদুর্যোগে কিছু সুবিধা থাকার কথা। তাদের প্রশিতি যথেষ্ট লোক থাকার কথা এবং তাদের দ্রুতগতির যানবাহন থাকার কথা। কিন্তু সারা সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানের পাঁচটি ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন শুধু আংশিকভাবে সক্রিয় হয়েছে। যখন নভেম্বরের ১৬ তারিখে সামরিক বাহিনী ত্রাণকার্যের আদেশ পেল, ৫,০০০ লোক জীবিতদের কলেরা এবং টাইফয়েডের প্রতিষেধক দেয়া, মৃতদের কবর দেয়া এবং রাস্তাঘাট পুননির্মাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখলো। কিন্তু পাকিস্তান-সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসন এবং রেডক্রসের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল। কিছু ব্রিটিশ উদ্ধার-বিমান ঢাকায় কিছু অলস সময় কাটালো, রেডক্রস না সেনাবাহিনী তাদের পরিচালনা করবে এ-বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হবার কারণে। এ-সপ্তাহের মঙ্গলবার আর্মিকে একটা বড় মতা দেয়া হলো, রিলিফ কমিশনার হিসেবে একজন বেসামরিক লোককে সরিয়ে একজন সেনাবাহিনীর লোককে সেখানে বসানো হয়েছে। এবার কিছু কাজ হওয়া উচিত।

অনেক লোককে অবাক করেছে যে বিষয়টি, সেটা হল, পাকিস্তান এয়ার-ফোর্সের ২৫টি হেলিকপ্টার থাকা সত্ত্বেও শুধু একটিকে দুর্গতদের ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেবার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এটা ঠিক যে হেলিকপ্টারগুলোর বেশিরভাগই বেশি ওজন নিতে পারে না। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করলে খুবই কাজে দিত। পূর্ব পাকিস্তানের রিলিফ কমিশনার জানিয়েছেন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হেলিকপ্টার আনতে গেলে ভারত তাদের দেশের ওপর দিয়ে উড়ে আসতে সেগুলোকে অনুমতি দিত না। পাকিস্তান-বিমানবাহিনীর বেশিরভাগ স্টেশন পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত। ভারত বলেছে তাদের অনুমতির জন্য কখনোই জিজ্ঞেস করা হয়নি। মূল ব্যাপার হল, যেহেতু পাকিস্তানের হেলিকপ্টারগুলো সামরিক হেলিকপ্টার এবং সেগুলো আসার পথে ভারতে অবতরণ করতে হতো, তাই পাকিস্তান কর্তৃপ সেগুলোকে ত্রাণের কাজে ব্যবহার করতে দিতে চায়নি। এখন ব্রিটিশ হেলিকপ্টার এবং এসল্ট-নৌকাগুলো বঙ্গোপসাগরের জাহাজ থেকে পরিচালিত হচ্ছে, এবং আমেরিকান হেলিকপ্টারগুলো আসতে শুরু করেছে। এবারে হয়তো রিলিফ বিতরণের কাজটি ঠিকঠাকমতো এগুবে। আশার কথা এই যে, বেঁচে যাওয়া হতভাগ্যদের অনেকেই তাদের কাছে রিলিফ পৌঁছার আগে ক্ষুধা, রোগ ও ঠাণ্ডায় মারা যায়নি।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বুধবার দু’দিনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন ব-দ্বীপ অঞ্চলে হেলিকপ্টার-ট্যুর দেবার উদ্দেশ্যে, দু’সপ্তাহ পরের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে। রাওলাপিন্ডির সরকার এটাকেই ভেবেছেন পূর্ববঙ্গের জন্য যথেষ্ট করা হচ্ছে। সাইকোনের পূর্বে অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচনী ইস্যু। এখন পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে ত্রাণ-বিতরণে এবং ‘মানবেতিহাসে বৃহত্তম প্রাকৃতিক-দুর্যোগ মোকাবেলায়’ ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে। এগারোটি দল নির্বাচন বাতিল করার দাবি জানিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সম্ভাব্য বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সময় নিয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি। কিন্তু পিকিংপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি তাদের প্রার্থীদের নাম প্রত্যাহারের জন্য বলেছে। নির্বাচন-স্থগিত-হবার-ঘোষণা কিছু দলের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। কারণ, তদের অনেকে খেলাপি হবার জোর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে কেউই খুব পরিষ্কারভাবে কিছু ভাবছে না।

, , ,

Comments are closed.