Warning: Creating default object from empty value in /home/genocidebangladesh/genocidebangladesh.org/wp-content/themes/canvas/functions/admin-hooks.php on line 160
Tag Archives | লন্ডন

লাখ লাখ মানুষের যাত্রা

সুনন্দ দত্ত-রায়

দি অবজারভার ১৩ জুন, ১৯৭১

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

পূর্ব-পাকিস্তান জুড়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সৈন্যরা যেভাবে দেশটিকে জনমানুষশূন্য করে তুলেছে তা দেখে যেকেউ হতাশ হবে। দেশবিভাগের পর থেকে এই মুসলিম দেশে এক কোটি হিন্দু আশা নিয়ে বেঁচে ছিল এবং এরপর ২৩ বছর ধরে অবিচার ও নিবর্তন ভোগ করেছে, এরপর সবশেষে তারা বুঝতে পেরেছে তাদের একমাত্র আশার প্রতিফলন ভারতেই রয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই গণদেশত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত ষাট লাখেরও বেশি মানুষ চলে গিয়েছে। কিছু লোক গিয়েছে সাম্প্রদায়িক ভাবনা থেকে তাদের মহিলাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। বাকিরা গিয়েছে চাকরি হারানোর পরে, জায়গাজমি খোয়ানোর পরে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলেও হাজার হাজার লোক চলে গিয়েছে; অন্যান্যরা ভারতে চলে গিয়েছে কারণ জীবনের অনিশ্চয়তার ভার তারা আর বইতে পারেনি।

গত বছরের কোনো এক সময়ে পূর্ববাংলায় এখনও অবস্থানরত হিন্দুরা আওয়ামী লীগের শেখ মুজিবের দেয়া প্রতিশ্র“তি অনুসারে সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান জীবনের দাবিতে মিছিল করেছে। শেখ মুজিব ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল এবং বর্তমানে জেলে বন্দি আছেন। কিন্তু পাকিস্তানী সৈন্যকে নির্দেশ দেয়া হলো শেখকে শেষ করে দেবার জন্য, সৈন্যদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক যারা আছে, তাদেরও কট্টর হতে উৎসাহিত করা হয়েছে।

কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশ-মিশনের (পূর্ব পাকিস্তান-মিশন) প্রধান হোসেন আলি বলেন সামরিক শাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান তার অফিসারদের ডেকে নিয়ে হিন্দু লোকজনকে হত্যা করার জন্য ও হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করার জন্য ও তাদের ফসল নষ্ট করে দেবার জন্য বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরকম নির্দেশ দেয়া হোক বা না হোক, সৈন্যদের কাজকারবার দেখে মনে হয় তেমনই কিছু বলা হয়েছে। কিন্তু যে দেশে হিন্দু ও মুসলমানরা একই পোশাক পরিধান করে, একই খাবার খায়, একই উপভাষায় কথা বলে, বেসামরিক লোকদের সাহায্য ছাড়া ঐ নির্দেশ পালন করা সম্ভব ছিল না।

পূর্ব-বাংলায় ‘স্বাভাবিকত্ব ফিরিয়ে আনা’র জন্য গঠিত ‘শান্তি-কমিটি’ এখন কাজগুলো করছে। লিফলেট দিয়ে এবং লাউড-স্পিকারের মাধ্যমে তারা মুসলমানদের আহ্বান করছে হিন্দুদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের সম্পত্তি দখল করার জন্য। আওয়ামী লীগের মুসলমানরা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শান্তি রক্ষার কাজে যোগ দিতে পারে এবং দেশে থেকে যেতে পারে। যেসব হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট দিয়েছে তাদের অবশ্যই চলে যেতে হবে। ফলে ২৫ মার্চের পর থেকে ৪০ লাখ হিন্দু উদ্বাস্তু সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে গিয়েছে। যদি পাকিস্তানী সৈন্যরা পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলেও যায়, হিন্দুরা আর ফিরতে চাইবে না। অন্যদিকে ভারতকে বাকি ষাট লাখ হিন্দুকে, যারা এখনও পূর্ববঙ্গে রয়েছে ও তাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকবে, তাদের গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

শেখ মুজিবের বাংলাদেশ-আন্দোলনের সময় দু’ধরনের হিন্দু পূর্ববাংলায় ছিল। তাদের একদল ছিল পেশাজীবী লোকজন যাদের জীবন সম্পর্কে পরিকল্পনা ছিল এবং মুহূর্তের নোটিশে দেশত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল। অন্যদল ছিল কৃষকরা যাদের এখন বাধ্য হয়ে যেতে হবে। সফল আইনজীবীরা বাঁশের চাটাইয়ের বা টিনের তৈরী ঘরে থাকতো। ডাক্তাররা নড়বড়ে ঘরে প্র্যাকটিস করতো। তাদের জীবন, ছেলেমেয়ে ও অর্থ সবকিছু নিরাপত্তার জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হতো। অন্য হিন্দুরা ছিল কৃষক, কামার, জেলে, তাঁতি এবং এরা সবাই নিুবর্ণের হিন্দু ছিল।

বর্তমানে কলকাতায় অবস্থানরত একজন ফেরারী মধ্যবিত্ত হলেন চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার ডিজাইন সেন্টারের প্রধান। তিনি নিশ্চিত যে ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্য ছিল দুই ধর্মের মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন শেষ করে দেয়া, পুরোপুরি রাজনৈতিক একটি ব্যাপারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং ভারতীয় মুসলমানদের ওপর পাল্টা আঘাত হানাকে উসকে দেয়া। এধরনের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত সৃষ্টি হতে দেখে বিশ্বের হয়তো সামরিক শাসনের প্রকৃত নিপীড়নমূলক ভূমিকা থেকে দৃষ্টি সরে যাবে।

এই পরিকল্পনা হয়তো ভালোভাবে বাস্তবায়িত হতো যদি না হিন্দু উদ্বাস্তুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃশেষ না হয়ে যেতো। এরপরও ভারতীয় সীমান্ত-শহর বারাসাত ও বসিরহাটে কিছু সাম্প্রদায়িক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পুলিশের একটি শক্তিশালি দল হিন্দু উদ্বাস্তুদের নিবৃত্ত করতে পেরেছিল। তারা বর্শা, ছুরি, লাঠি হাতে মুর্শিদাবাদ থেকে এখানকার মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করতে এসেছিল। একজন উদ্বাস্তু বলল, “শান্তি-কমিটির লোকজন আমাদের বলেছে ভারতে চলে যেতে কারণ এখানেই নাকি আমাদের সবার জন্য খাদ্য ও জমি আছে। এখন আমরা এখানে মুসলমানদের পাকিস্তানে চলে যেতে বলব”।

এরমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বের শহর সিলেটে হিন্দুদের পরিত্যক্ত বাড়িগুলো স্থানীয় মুসলমানরা ন্যূনতম মূল্যে নিলামে তুলেছে। এমনকি ঢাকায় পরিত্যক্ত বাড়িগুলো বণ্টনের একটি আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন হয়েছে। ইয়াহিয়া খানের সরকারের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ধানী জমি বণ্টন করা হয়েছে। এপরিস্থিতিতে নিরাপদে দেশে ফিরে যাবার জন্য ইয়াহিয়ার প্রস্তাব উদ্বাস্তুদের পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন।

হাসান মনে করেন পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম দালালরা বাঙালি নয়। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রি নূরুল আমিন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর গুরুত্বপূর্ণ অনুসারী। কিন্তু তিনিও সামরিক শাসকদের অধীনে পুতুল সরকারের প্রধান হতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এই প্রত্যাখান অন্তঃত একটি ভুয়া গণতান্ত্রিক সরকারের সম্ভাবনাও নাকচ করে দেয় এবং সামরিক শাসন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। ইয়াহিয়া খানের শাসনের প্রতি কেবল মুসলিম লীগ (যারা সবসময় সামরিক শাসনকে সমর্থন করে এসেছে) এবং কট্টর ইসলামী দল জামায়াত-ই-ইসলামী ও নিজামী-ই-ইসলাম-এর লোকজনের আনুগত্য আছে। একত্রে তারা সারা দেশের ১৯ শতাংশেরও কম। তাদের মধ্যে মাত্র শতকরা পাঁচ জন বাঙালি। বাকিরা হলো বিহারি মুসলমান — যারা দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিল এবং পাঞ্জাবী — অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য যারা পূর্ব-পাকিস্তানে গিয়েছিল।

এরকম কিছু ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায় যেখানে বাঙালি মুসলমান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এধরনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে ফিরে যাবার জন্য খুব কমই আশা জাগায়। আমি বিশ্বাস করতে প্রস্তুত আছি যে শেখ মুজিব সাড়ে ছয় কোটি মুসলমান ও এক কোটি হিন্দুদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব ও উদারতার কারণে হিন্দু জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছিল। প্রাদেশিক পরিষদের জন্য আওয়ামী লীগের টিকেটে এগারো জন হিন্দু নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে-পরিষদ অবশ্য সামরিক শাসকরা বাস্তবায়িত হতে দেয় নি।

পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিমাঞ্চলের জেলা পাবনার জেলাপ্রশাসক আমাকে যা বললেন হিন্দুদের জন্য তা এরচাইতেও আশাপ্রদ ব্যাপার ছিল। জেলাপ্রশাসকের নাম নূরুল কাদের, তিনি কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের অর্থনীতির গ্র্যাজুয়েট। ডিসেম্বরের নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে তিনি এক হিন্দুর কিছু জমিজমা বিক্রির ব্যাপারে কাজ করছিলেন। লোকটি পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে যেতে চাইছিল। কিন্তু যখন শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করলেন তখন লোকটি দেশে থেকে যেতে চাইলো এবং কেমব্রিজের তরুণটি এখন নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি সচিবলায় সংগঠিত করার জন্য কাজ করছেন। কিন্তু এই সরকারের একটি জাতীয় পরিচয় ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু এই সরকারের কোনো নেতার শেখ মুজিবের মতো কারিশমা নেই। কিন্তু কাদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে পুনরায় মতৈক্যের কোনো সম্ভাবনা নেই। হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ গভীর দাগ ফেলে গেছে। আর এইসব অপরাধের সঙ্গে ব্যাপকমাত্রায় যুক্ত হয়েছে যৌন হয়রানির ঘটনা। কাদের জানালেন যে, এমনকি উচ্চমধ্যবিত্তের মেয়েদের ক্যান্টনমেন্টের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

একজন দাড়িওয়ালা ট্রাভেল-এজেন্ট যুবক, যিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন, তিনি জানালেন, “সেনাবাহিনীর আক্রমণের পূর্বে মাত্র ১৫ শতাংশ লোক স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছিল। এখন মাত্র ১৫ শতাংশ পশ্চিম-পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো প্রকার যৌথতার ব্যাপারে সায় দেবে”। কিন্তু যদি একত্রিত পাকিস্তানের আর কোনো সম্ভাবনা না থাকে, পূর্ব বাংলার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অনেক সময় লাগবে। প্রথম প্রতিরোধ শক্ত হাতে দমন করা হয়েছে। প্রথম প্রতিরোধটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, বিচ্ছিন্ন এবং কেবল আবেগগত তাড়না থেকে পরিচালিত হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত টেকে নি। এতে অনেক ভুল ছিল; এটা ছিল অতিমাত্রায় আশাবাদযুক্ত। বাঙালিরা ভেবেছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অভ্যস্ত পরোক্ষ অবাধ্যতার মাধ্যমেই পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কঠোর সৈন্য ও নিষ্ঠুর অফিসারদের মোকাবেলা করবে।

দ্বিতীয় পর্বের প্রতিরোধ এখন শুরু হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পূর্ব-পাকিস্তান রাইফেলস্ ও পুলিশ বাহিনীর ২০,০০০ সৈনিক একক নেতৃত্বের অধীনে কাজ করছে। ৮,০০০ কিশোর-তরুণ গেরিলা যুদ্ধের জন্য ট্রেনিং নিচ্ছে। দালালদের শেষ করার জন্য কিলার স্কোয়াড গঠিত হয়েছে। একজন বাংলাদেশী নেতা আমাকে বললেন তিনি সাফল্যের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ “যদি আমরা আমাদের জন্য কাজ করি’’। এর মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানের জন্য কোনো বিদেশী সাহায্যের জন্য অস্বীকৃতি জানালেন। বর্তমানে পূর্বাংশে চার ডিভিশন পাকিস্তানি সৈন্যর জন্য প্রতিদিন এক কোটি রুপি ব্যয় হচ্ছে। পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক চাপ নিঃসন্দেহে পাকিস্তানী সৈন্যদের জোর কমিয়ে দেবে, কারণ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ২,৫০০ মাইল পাড়ি দিয়ে সৈন্যদের জন্য ৩০০ টনের সরবরাহ প্রতিদিন আনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের আন্দোলনকারীরা একটু আশাবাদী হতে পারে এজন্য যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কেবল পূর্ব পাকিস্তানে আর সীমাবদ্ধ নেই, পশ্চিম পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বিশিষ্ট পাঠান-নেতা ওয়ালি খানের কথা উল্লেখ করা যায়। মি. ভুট্টো সেনাবাহিনীকে বলছেন রাজনৈতিক সমস্যা রাজনীতিবিদদের সমাধান করতে হবে এবং তিনি শিগগীরই ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলে আসছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের কুখ্যাত ২১ ধনী পরিবারের লোকজন ঠিকই বুঝতে পারছে পূর্ব পাকিস্তানের বাজার হারিয়ে ফেললে কী বিপদ হবে। ইয়াহিয়া খান এখন বুঝতে পারছেন, পশ্চিমের প্রভাবশালী লোকজন এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে পূর্বের যেকোনো সময়ের মতো কঠোর হয়ে উঠবে। রাষ্ট্রপতি হয়তো দমননীতির চূড়ান্ত পর্যায় পার হয়ে এসেছেন। ঢাকায় উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি একসময় যে-সমাধানের কথা বলেছিল, ইয়াহিয়ার কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে তিনি সেদিকেই যাচ্ছেন। কিন্তু ব্যাপার হলো ঢাকা এখন আর সেকথা শুনবে না।

কিন্তু একদিন যদি বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়ও, পাকিস্তান সেনাবাহিনী-সৃষ্ট সফল সাম্প্রদায়িক পারিস্থিতি ও বাঙালি হিন্দুদের ব্যাপকমাত্রায় প্রস্থান, বাংলাদেশকে একটি কেবল মুসলমানের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এমনকি এখনকার তাজউদ্দীনের মন্ত্রিসভায় কোনো হিন্দু সদস্য নেই। এবং বাংলাদেশের জন্য ভারতীয়দের ব্যাপক সহানুভূতি সত্ত্বেও, এটা একটা দুঃখজনক ব্যাপার যে যেসব হিন্দু কয়েক বছর আগে ভারতে বসতিস্থাপনের জন্য গিয়েছিল তারা বাংলাদেশের জন্য কোনোরকম সহযোগিতা প্রদানের বিরোধী।

Read full story · Comments are closed

উত্তাপ থেকে বেরিয়ে আসা সত্যবক্তা

এন্থনি মাসকারেনহাস
দি টাইমস, ১৩ই জুন, ১৯৭১(?)

অনুবাদ: ফাহমিদুল হক

এন্থনি মাসকারেনহাসকে গ্রানাডা টেলিভিশন (পত্রিকাগুলো এনামেই ডাকে) গত সপ্তাহে সাহসী সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ পুরস্কার প্রদান করেছে। করাচির একটি পত্রিকার সহকারী সম্পাদক এবং সানডে টাইমসের প্রতিনিধি মাসকারেনহাস পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে রিপোর্ট লিখেছেন। তিনি জানতেন তিনি যা দেখেছিলেন তা তার দেশে ছাপানোর অনুমতি পাওয়া যাবে না। তিনি ইংল্যান্ড থেকে পালিয়ে আসেন এবং সানডে টাইমসে যে রিপোর্ট লেখেন, তা পূর্ব পাকস্তানে কী হচ্ছে সে-সম্পর্কে বিশ্ববাসীর ধারণা পাল্টে দেয়।

স্থান: কুমিল্লা সার্কিট হাউস, পূর্ব পাকিস্তান।
তারিখ: এপ্রিল ১৯, ১৯৭১।
সময়: সন্ধ্যা ৬.১৮।

এটা হলো সেই মুহূর্ত যা আমার জীবন পরিবর্তন করে দিল। কারফিউ ছয়টার সময়ে শেষ হয়েছে। কয়েক মিনিট আগে আমি সেবাস্টিয়ান এবং তার চারজন সহযোগীকে রাস্তা দিয়ে স্থানীয় সামরিক আইন প্রশাসক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেজর আগার অফিসে আসতে দেখলাম। পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টরের পেছনে তারা আসলো, তাদের হাত ও পা একটি দড়িতে আলগা করে বাঁধা। তাদের পরনে যে-ইউনিফর্ম পরা ছিল তা নতুন বলেই মনে হলো।

আমি সেই সাব-ইন্সপেক্টরকে স্মরণ করতে পারি। সে-সকালে মেজর আগার অফিসে নারিকেলের দুধ খেতে খেতে তিনি লক-আপে আটকে রাখা বন্দিদের তালিকা দেখালেন। তিনি তার গ্লাস পাশে সরিয়ে রাখলেন। এরপর চারটি নামের পাশে টিক চিহ্ন দিলেন। তিনি বললেন, “এই চারজনকে নিকেশ করার জন্য আনেন”। এরপর তিনি আবার তার তালিকার দিকে তাকালেন। আবার পেন্সিল দিয়ে খোঁচা দিলেন। “এবং এই চোরকে তাদের সঙ্গে আনেন”। আমাকে জানানো হলো ‘চোর’টি হলো সেবাস্টিয়ান নামের একজন যে তার হিন্দু বন্ধুর জিনিসপত্র নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবার সময় ধরা পড়ে। এখন কারিফউয়ের পরে আমাকে জানতে হলো নিকেশ করার অর্থ কী। হঠাৎ আমি মারধরের শব্দ শুনলাম এবং এরপর চিৎকার শুনলাম। আরও জোর-আঘাতের শব্দ এবং আরও বিকট চিৎকার শুনলাম। আমি ব্যালকনির শেষ প্রান্তে ছুটে গেলাম কী হচ্ছে তা দেখার জন্য। যখন আপনি দেখবেন মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, সেই দৃশ্য এবং সেই শব্দ আপনি আপনার স্মৃতি থেকে কোনোদিনই মুছতে পারবেন না।

আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি চিৎকার করতে চাইলাম কিন্তু কোনো শব্দ মুখ থেকে বেরুলো না। তার পরিবর্তে আমি আমার মাথা ও বুকে বিরাট ভার অনুভব করলাম। অসহায়ভাবে আমি চারিদিকে তাকালাম সাহায্যের জন্য। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে-গণহত্যা চালাচ্ছে, তার মুখোমুখি আমি এই প্রথম হলাম, তা নয়। কিন্তু এই প্রথম আমি এতো নিষ্ঠুর কিছু দেখলাম। আমি জানালার পাশের একটি নিচু চেয়ারে বসে পড়লাম এবং মানুষগুলোর চিৎকারের দৃশ্য আর দেখতে চাচ্ছিলাম না। এরপর বিষণ্ণভাবে দেখলাম লেক পার হয়ে অনেকগুলো বাদুড় আমার জানালার দিকে আসছে। তাদের দেখতে ভ্যাম্পায়ারের মতো লাগছিল, কিন্তু তারা আসলে খাদ্যসন্ধানী ‘উড়ন্ত শৃগাল’। মনে পড়ে, আমি নিজেকে বললাম, “সত্যিকারের ভ্যাম্পায়াররা তো নিচের তলায়”।

আমি হিটলার সম্পর্কে যা কিছু পড়েছি, তার চাইতে ভয়াবহ কিছু প্রত্যক্ষ করলাম― এবং আমাদের নিজেদের মধ্যেই এসব ঘটছিল। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, এই সত্য আমি সবাইকে জানাবো। কিন্তু আমি যা দেখলাম তা হলো, অন্য সৈন্যরা বন্দুক হাতে পুরো ঘটনাবলী দেখছিল এবং অন্যরা নিরবে রাতের খাবার তৈরি করছিল। আমি জানতাম কোনো আশাই কোথাও নেই। আমি হতাশ হয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম এবং খালি ব্যালকনির অপর প্রান্তে আমার রুমে ফিরে আসলাম। আমি আমার জীবনের দীর্ঘতম রাতে জেগে জেগে ঠিক করালাম পরের দিন থেকে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে, যতটুকু সম্ভব দেখতে ও শুনতে হবে এবং বিস্তারিতভাবে আমার নিজস্ব সাঁটলিপি পদ্ধতিতে লিখে রাখতে হবে যাতে কেউ তা বুঝতে না পারে। এভাবে আমি হাজীগঞ্জের হত্যা ও পোড়ানোর দৃশ্য ও কোনো মানুষকে খুঁজে না পাওয়া, অফিসার্স মেসে ‘টপ স্কোর’-এর প্রতিযোগিতা, এবং ১৬ ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে লক্ষ্যের প্রকারভেদ সম্পর্কে আমাকে দেয়া সংজ্ঞা প্রভৃতি জিনিস লিপিবিদ্ধ করি।

আমি করাচিতে ২৫ এপ্রিল এসব নোট নিয়ে ফিরে যাই এবং বাড়ি পৌঁছি ভোর সাড়ে তিনটায়। সেদিন ছিল আমার স্ত্রীর জন্মদিন। সে তার কানের দুলের জন্য গোলাপী মুক্তো চেয়েছিল, কিন্তু আমি তার জন্য সে-উপহার না নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরলাম যা ছিল আমার পরিবারের জন্য বিরাট পরিবর্তনের একটা ব্যাপার। যতক্ষণ না পাচকটি এসে ব্রেকফাস্ট তৈরি করল, স্ত্রী ইভন ও বড়ো দুই ছেলে অ্যালান ও কিথের সঙ্গে আলোচনা করলাম। আমি তাদের বললাম আমি কী দেখেছি এবং কী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইভন হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। এই সিদ্ধান্তের ফল কী হবে তা তার চাইতে আর কেইবা ভালো বুঝবে। এর ফলে আমাদের সবকিছু পরিত্যাগ করতে হবে, কারণ সামরিক শাসনের পরিস্থিতিতে আমরা কোনো সুযোগই পাবো না। এর অর্থ আমাদের মাথার ওপরের ছাদ, আয়, অর্জিত সম্পদ, সঞ্চয় দ্বারা ক্রয়কৃত বাড়ি করার জন্য জমি― কিছুই থাকবে না। একসময় কিথ বলল, “অবশ্যই আমরা তোমার সঙ্গে যাবো। তুমি অবশ্যই সবকিছু লিখবে”।

তারা সবাই আমার দিকে তাকালো, সম্ভবত প্রথমবারের মতো আমার চোখে গভীর একাকীত্ব তারা দেখতে পেল। আমরা একসঙ্গে কেঁদে উঠলাম, পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। এটা ছিল সামনের ভয়াবহ দিনগুলোর ও পরবর্তী মাসগুলোতে লন্ডনে নতুন জীবন শুরু করার পারস্পরিক আশ্বাস। আমাদের গোপন সিদ্ধান্তের কথা অন্য কেউ জানতো না। আমরা আমাদের আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব কাউকেই এর মধ্যে জড়াতে চাইনি, বলা যায়, এভাবে বিপদকে এড়াতেই চেয়েছি। আমি লন্ডনে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এটা দেখতে যে সানডে টাইমস সংবাদটি ছাপে কি না। অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে আমার বিশ্বাস ছিল যে, একজন পৃথিবীর সেরা সংবাদকাহিনী নিয়ে ফ্লিট-স্ট্রিটের ভবনগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু ছাপানোর জন্য কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না, তা হতে পারে না। এরপর আমি পত্রিকার জন্য লেখা শুরু করলাম।

সানডে টাইমসের আমার কথা শুনল, সবকিছু গ্রহণ করল এবং আমি থমসন হাউসে প্রবেশ করার চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই আমি পাকিস্তানে গিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত হলাম। সংবাদকাহিনীটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই গৃহীত হয় এবং সেখানে সাংবাদিকসুলভ সেই প্রবৃত্তি ও সততার পরিচয় পেয়ে এখন পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে রয়েছি।

পাকিস্তান থেকে বের হয়ে আসাটাই তখন বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। বহিরাগমণের অনুমতি নিতে হবে। যত নিরবে পারলাম, গুছিয়ে নিলাম। কারণ গোপনীয়তা রক্ষা করতেই হবে। সৌভাগ্যক্রমে আমি লন্ডন থেকে হোটেলের কিছু কাগজপত্র নিয়ে এসেছিলাম। আমি সেটা ব্যবহার করে তার ওপরে মিলান-প্রবাসী আমার স্ত্রীর একমাত্র ভাইয়ের (যিনি একজন বিখ্যাত ফ্যাশনডিজাইনার) পক্ষ থেকে তার বিয়েতে সপরিবারে যাবার আমন্ত্রণপত্র লিখলাম, তাতে তার ভাইয়ের সইও দিলাম। পুরো পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণবিষয়ক কাগজপত্র সেই চিঠির মাধ্যমে পাওয়া গেল। বাইরে থেকে এইমাত্র ঘুরে আসার কারণে আমি সেই ‘বিবাহঅনুষ্ঠান’-এ যেতে অস্বীকৃতি জানালাম।

এরপর আমি সানডে টাইমসে একটি টেলিগ্রাম পাঠালাম: “রফতানির প্রক্রিয়া সমাপ্ত। সোমবারে শিপমেন্ট শুরু হচ্ছে”। সেমতে ৭ জুন, সোমবারে আমি আমার পরিবারকে রোমগামী প্যান-আমেরিকান ফ্লাইটে তুলে দিলাম এবং নিজে লাহোর ও রাওয়ালাপিন্ডিগামী অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে রওয়ানা দিলাম। আমি সেখান থেকে আফগানিস্তানের পেশওয়ার বা কাবুলগামী বিমান ধরার জন্য এই রুটের আশ্রয় নিলাম কারণ উভয় দেশের ঐ দু’টি করে স্থানে পাকিস্তানি ও আফগানদের জন্য যাওয়া-আসা উম্মুক্ত ছিল। এটা একটা দুঃস্বপ্নের যাত্রা ছিল। বিমানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন যারা আমাকে ভালোভাবে চিনতেন। তারা যদি সামন্যতম সন্দেহও করতেন তবে আমি গ্রেফতার হতাম। আমি কোনোক্রমে তাদের সঙ্গে আলাপ করে গেলাম এবং প্রতিশ্র“তি দিলাম তাদের সঙ্গে পরের দিন লাঞ্চ করব। রাওয়ালাপিন্ডিতে গিয়ে দেখলাম পেশওয়ারের ফ্লাইট পুরোপুরি বুকড্ হয়ে গেছে। সে-পর্যায়ে আমি যদি ধরা পড়তাম তবে সব ভেস্তে যেত। ফিরে আসার কোনো উপায় ছিল না।

সুতরাং আমি ঠিক করেছিলাম আমাকে বলিষ্ঠভাবে চলাফেরা করতে হবে এবং সেখানে একজন আকর্ষণীয় পাঞ্জাবী তরুণী সাহায্য করেছিল। সে প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে বসে ছিল এবং আমাকে দেখছিল। একজন বিমান কর্মকর্তার হাতে একশ’ রুপির একটি নোট গুঁজে দিয়ে মেয়েটির দিকে ইশারা করে চোখ টিপে গোপনভঙ্গীতে বললাম, “আমার একটি সিট দরকার। আমি মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে কিছু মজা করার জন্য কাবুলে যাচ্ছি।” এধরনের কাজ করা থেকে পৃথিবীর কেউই আমাকে আটকে রাখতে পারত না। আমি নিশ্চিত আর কোনো কায়দাই কাজে আসতো না। কর্মকর্তাটি আরেকজন লোককে চোরাচালানের সন্দেহে আটকে দিল এবং আমার জন্য একটি সিট যোগাড় করে দিল। আমার উষ্ণভাবে করমর্দন করলাম এবং পেশওয়ার ও কাবুল হয়ে সানডে টাইমসে আমার দেয়া সময় রক্ষা করতে রওয়ানা হলাম। যে-অচেনা মেয়েটি আমার জীবন রক্ষা করল তাকে ধন্যবাদ দেবার কোনো সুযোগ আমি পাই নি। সে আরেকজন মহিলার সঙ্গে সামনের দিকে বসেছিল। কিন্তু যখন আমরা আফগানিস্তানের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করলাম তখন তার উদ্দেশ্যে মনে মনে শ্যাম্পেন দিয়ে উইশ করলাম।

Read full story · Comments are closed